রবিবার | ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ | ৬ বৈশাখ, ১৪৩৩

শিরোনাম
জীবিত থাকতেই অবসর ও কল্যাণ তহবিলের টাকা চাইলেন প্রধান শিক্ষক নির্মাণাধীন পাওয়ার গ্রিড উপকেন্দ্রে দুর্ধর্ষ ডাকাতির রহস্য উদঘাটন, ডাকাতদলের ১৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার গুরুদাসপুরে আইনজীবীর বিরুদ্ধে সরকারি রাস্তা জবরদখলের অভিযোগ পানিতে ডুবে আপন দুই ভাইয়ের মৃত্যু বড়াইগ্রামে ডাকাতির ঘটনায় ১৩ জন আটক, ট্রাকসহ লুন্ঠিত ইলেকট্রিক ব্যাটারি উদ্ধার চার মাস পর শুরু প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা শিবির একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জেলা শিবির সভাপতি জাহিদ হাসান পদ্মার পাঙ্গাস বিক্রি হলো ২০ হাজার টাকায় লালপুরে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি মৃদু তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন বড়াইগ্রামে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ

তিস্তায় আর স্যান্ডসার্ফিং করতে চাই না

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
আশ্বিনের ১২ তারিখ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তিস্তা নদীতে হঠাৎ করে খুব বেশী পানির চাপ দেখা দিয়েছে। লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়ে পানির চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে ডুবে সয়লাব হয়ে গেছে তিস্তা নদীর দুই পাড়ের বহু বাড়িঘর, আবাদী জমি, ভেসে গেছে পুকুরের মাছ। জলকপাট খুলে দিলেই হঠাৎ বন্যা শুরু হয় এবং বন্ধ করে দিলে পানির সাথে আসা পাহাড়ি বালু জমা হয়ে একদিকে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যায়।
অন্যদিকে বড় বড় চর জেগে ও আবাদী জমিতে নতুন খসখসে বালু স্তুপীকৃত হয়ে চাষাবাদের অনুপুযুক্ত হয়ে পড়ে। সেখানে রবিশস্য আবাদ করাও দুষ্কর হয়ে যায়। দিগন্তবিস্তৃত বালুভর্তি নদীতট ও বিরানভূমি বছরের পর বছর অনাবাদী পড়ে থাকে। বালুচরে ‘স্যান্ডসার্ফিং’করে প্রান্তিক কৃষকরা জীবন বাঁচানোর উপায় খুঁজে হণ্যে হয়ে বেড়ায়। এরা আমাদের দেশের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর তালিকাভূক্ত হলেও যুগ যুগ ধরে তাদের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে না।
এ ধরনের বন্যা নদী তীরবর্তী মানুষগুলোর জীবনে প্রতিবছরের বহু করুণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। ছবি তোলা হয়, ভিডিও তৈরী হয়, টিভি, ইউটিউবে সেগুলোর দুর্দশার ছবি প্রচারিত হয়। গোটা দেশের মানুষের সাথে বিদেশীরাও সেসব ছবি দেখে শুধু ‘আহারে’বলে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। সরকারী কর্মচারীরা ক্ষয়ক্ষতির হিসেব নিরুপণ করে লিখে নিয়ে যান। রাজনৈতিক নেতারা আশ্বাস দেন এইতো সামনে তিস্তা মহাপরিকল্পনা আসছে। আরেকটু অপেক্ষা করুন।
কিন্তু সেই অপেক্ষার পালা আর শেষ হতেই চায় না। প্রতিবেশী ভারতের একান্ত বন্ধুপ্রতিম সরকার তিন তিনবার ক্ষমতায় এসেছিলেন। তবুও তিস্তা পুনুরুজ্জীবন করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে বহু চেষ্টা তদবির আলোর মুখ দেখেনি। তিস্তাপাড়ের মানুষ অনেকটা আশ্বস্থ হয়ে দিন গুজরান করার পর শেষ পর্যন্ত চরম হতাশার মধ্যে ডুবে গেছে।
ইতোমধ্যে তরুণদের প্রচেষ্টায় এক নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগষ্টের আন্দোলনের ফসল হিসেবে একটি অন্তবর্তীকালীণ সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মাথায় দেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে সীমান্তের ওপাড় থেকে আসা উজানের ঢলে এক প্রলয়ঙ্কারী বন্যা বয়ে গেছে। এর ক্ষত শুকানোর চেষ্টা করা হলেও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য তা সহজে পুষিয়ে ওঠার মতো নয়।
এরই মাঝে বার বার অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে দেশের বড় বড় শহরের রাস্তা-ঘাট, সারা দেশের আবাদী জমির ফসল। ঘন ঘন বন্যার কারণে বীজতলা পচে যাওয়ায় আমন ধানের চারা লাগানো সম্ভব হয়নি বহু জেলায়। শুধু দেশের উত্তরাঞ্চলে উপর ভরসা করে আমনের ক্ষতি পুষিয়ে নেবার হিসেব কষা হচ্ছে। সেই উত্তরের নদ-নদীতে কৃত্রিম বন্যার কারণে আমন আবাদের হিসেবে গড়মিল শুরু হয়েছে।
এবার আশ্বিনে তিস্তা নদীতে নতুন করে বান ডেকেছে। একই সাথে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় হাতীবান্ধায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেইট খুলে দেয়ায় হু হু করে বানের পানি বেড়ে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির ধানের চারা।
একটানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের চরাঞ্চল ছাড়াও কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পড়েছে। গত দুইদিনে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কৃষকের ধান, বাদাম, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। একটি দৈনিক পত্রিকায় বলা হয়েছে, “লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটির বাসিন্দা কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, গত দুইদিন ধরে বাড়িতে পানি ওঠায় চুলা জ্বালাতে পারছি না। তাই খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি। দিনে একবার রান্না করাই কষ্টকর। একই এলাকার নদী তীরবর্তী বাসিন্দা মজিবর রহমান (৫২) বলেন, গত দুইদিন ধরে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানির ভয়ঙ্কর শব্দের রাতের ঘুম হারিয়ে যায়। গতরাতে তার প্রতিবেশীর বাড়ির একটি ঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি বাড়ি ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে। আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের গোবর্ধণ এলাকার বাসিন্দা আফজাল হোসেন (৫৫) বলেন, তিস্তার ভয়াল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে গত ১৫ বছরে কতজন এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। এখন তিস্তায় পানি বাড়লেই আমাদের এলাকায় প্রবেশ করে।”
এসময় উজানের পানিতে বয়ে আসে পাহাড়ি বালুকণা। বালুতে ডুবে যায় উর্বর জমি। সেসব জমিতে নতুন করে চর পড়ে যায়। ফসলের আবাদ দুরে থাক, সহসাই সেসব জমিতে ঘাসও জন্মায় না।
এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ভারত বার বার পানি ছেড়ে দিয়ে ঘন ঘন বন্যা সৃষ্টি করছে। এমনকি আশ্বিনের বন্যা নয়- গত বছর চৈত্র মাসেও বন্যা হয়েছিল।
এর কারণ অনুসন্ধান করে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে চীনের হোয়াংহো নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের অভিজ্ঞতার আলোকে তিস্তা পুনুরুজ্জীবন করার মহাপরিকল্পনা নিয়ে বহুদিনের আশা যখন আলোর দিকে তখন চীন ও ভারতের মধ্যে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির কর্তৃত্ব নিয়ে দ্ব›দ্ব খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ চরম ক্ষতির শিকার হলেও ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচে সেখানে অনেকটা অসহায়। তিস্তা আন্তর্জাতিক নদী। যার উপরে ভারতের সিকিম ও আসাম অঞ্চলে অনেকগুলো জলবিদ্দুৎ প্রকল্প রয়েছে। আরো রয়েছে মহানন্দা ও হুগলীর সংগে যুক্ত হয়ে কোলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষার জন্য তিস্তার পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে সেদিকে নিয়ে যাবার কৃত্রিম চ্যানেল।
যখন তিস্তার উজানে বান ডাকে, অতিবৃষ্টি হয়ে সয়লাব হয়ে যায় শুধু তখনই অতিরিক্তি পানির চাপ সামাল দিতে না পেরে বাংলাদেশের দিকে গাজলডোবার জলকপাট খুলে পানি ছেড়ে দেয়া হয় আর এটাই আমাদের দেশের মানুষের জন্য বার বার সর্বনাশ ডেকে আনে!
আমাদের জন্য এটাই তিস্তা বিপর্যয়। এটা জীবন-মরণের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে তিস্তাপাড়ের কোটি কোটি মানুষের জন্য।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান খুব তৎপর রয়েছেন একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য চেষ্টা করতে। কিন্তু সম্প্রতি শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে গিয়ে অবস্থান করছেন। যা উভয় দেশের সম্পর্ক শীতল করার জন্য বড় উপাদান হিসেবে কাজ করছে। এমন বিব্রতকর সময়ে কি তিস্তা নিয়ে কোন বৈঠক কার্যকরী করা সম্ভব হবে?
এই মুহূর্তে বিশ্বসমাজের দৃষ্টি বাংলাদেশের দিকে। নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উন্নয়ন দর্শন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে যতটা না কাজে লেগেছে তার চেয়ে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর কল্যাণে বেশী দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তুু বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার একই সংগে সূচিত করতে হলে যে প্রেক্ষাপট তৈরী করা দরকার সেজন্য প্রতিবেশী দেশ বিশেষ করে ভারতের উদারতা প্রয়োজন। কিন্তু ভারত সেটা না করে বিভিন্ন দিক দিয়ে শুধু নিত্যনতুন সমস্যা তৈরীর উপাদান ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
এমতাবস্থায় তাহলে তিস্তার পানি সমস্যার সমাধান কি করে হবে? তাই কারো মুখাপেক্ষি হয়ে না থেকে আমার অংশের তিস্তা দিয়ে আমি কি করতে পারি-সেটাই এখন দেখার বিষয়। কারণ, বর্ষায় বার বার জলকপাট ছেড়ে দেয়া বন্যা, আশ্বিনে বন্যা, চৈত্রে বন্যা আর সহ্য করার মতো নয়।
প্রতিবছর দেশের উত্তরে বন্যা, পশ্চিমে বন্যা, পূর্বে বন্যা- যখন তখন বন্যার তোড়ে ভেসে যাওয়া কি আমাদের নিয়তি হয়ে থাকবে? শীত ও গ্রীষ্মকালে তিস্তা নদীর বালুচরে স্যান্ড সার্ফিং করে আর কতকাল ধুলোবালি মেখে ঘরে ফিরবে সেখানকার ভুক্তভোগী মানুষজন? আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে আর নতুন কোন বৈষম্য সৃষ্টি হোক তা শুনতে ও সহ্য করতে চাই না। সামনের দিনগুলোতে আর কখনই আমরা তিস্তার ধূ-ধূ বালুচরে চরে ‘স্যান্ড সার্ফিং’করে সময় নষ্ট করতে চাই না। তরুণ প্রজন্মের গঠনমূলক অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক নদী তিস্তাসহ দেশের সকল নদীর পানি বৈষম্যের আশু অবসান হোক।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.