বুধবার | ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ | ২ বৈশাখ, ১৪৩৩

শিরোনাম
বড়াইগ্রামে কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণ বৈশাখ বর্তমানকে উদ্‌যাপন ও ভবিষ্যতের জন্য নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে- সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী পুতুল ভবন থেকে পড়ে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু দেশের উন্নায়নে সবাই ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করতে হবে- প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন গৌরীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠিত ইলিশ নেই, সরপুঁটি আছে স্যার ! অপরাধ দমনে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না-প্রতিমন্ত্রী পুতুল কলেজ শিক্ষকের কাছে ডাকযোগে কাফনের কাপড়, তদন্তে পুলিশ বড়াইগ্রামে জিন্নাহ হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার উদ্বোধন ১২ এপ্রিল বিশ্ব পথশিশু দিবস: বিশ্ব পথশিশু দিবস ও শিশুকল্যাণে লিডো-র ভূমিকা

ইলিশ নেই, সরপুঁটি আছে স্যার !

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
প্রতিবছরের ন্যায় এবারেও আমাদের বিভাগীয় বৈশাখী উদযাপন কমিটি পহেলা বৈশাখী উদযাপনের আমন্ত্রণপত্র দিতে এসেছিল । জিজ্ঞেস করলfম এবারের পান্তার সাথে কত প্রকারের ভর্তা হবে? স্যার কমপক্ষে ১0 প্রকারের ভর্তা তৈরী হবে। আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগে পাশের জন বলতে লাগলো, স্যার মনে কিছু করবেন না। এবার কিন্তু ইলিশ ভাজা নেই। কারণ বাজেটে কুলাবেনা জন্যে ইলিশের পরিবর্তে স্বরপুঁটি রাখা হয়েছে। একেকটি আস্ত সরপুঁটি ভাজা পাবেন স্যার!
ইলিশ নেই সরপুঁটি ভাজা আছে স্যার শুনে মনটা অনেকটি বিষন্ন হয়ে উঠলেও সেটা ওদের সামনে লুকাতে চেষ্টা করলাম। বললাম, ঠিক আছে। ওই বাজেটে ইলিশ না হলেও বৈশাখী অনুষ্ঠান তো আর ইলিশের জন্য বসে থাকবে না! ও হ্যাঁ শোনো, পান্তার পর বাতাসা ও কদমা রেখো কিন্তু। ওরা আমার কথা শুনে খুশি হয়ে চলে গেল বলে মনে হলো।
আজ আয়োজকদের কণ্ঠে যখন শোনা গেল, স্যার, ইলিশ নেই, সরপুঁটি আছে তখন এটি আমার একার কষ্ট মনে করেছিলাম। কারণ, আমি ইলিশ পাগল মানুষ। এটা বিভাগের সবাই জানে। তাই অন্যেরা হাসাহাসি করতে পারে জন্যে চুপ করে গেলাম। পরে কলিগদের মুখের ভাষা শুনে বুঝলাম তারাও আমার মতো কষ্ট পাচ্ছে! এর সাথে আমাদের বিভাগের এবারের ইলিশবিহীন বৈশাখী অনুষ্ঠান আমাদের দেশের অর্থনীতি, বাজারব্যবস্থা এবং ভোগ সংস্কৃতিক শুণ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
এক সময় পান্তা-ইলিশ ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলোতে ইলিশের প্রাচুর্য ছিল, দামও ছিল তুলনামূলকভাবে সহনীয়। কিন্তু আজ ইলিশ ক্রমেই ‘প্রিমিয়াম পণ্য’ হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের জন্য তা যেন বিলাসিতার প্রতীক। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পহেলা বৈশাখে ইলিশ কেনা মানে একধরনের আর্থিক চাপ। ফলে ইলিশ এখন অনেকটাই বিশেষ শ্রেণির ভোগ্যপণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানে আমাদের ভোগ সংস্কৃতির বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পান্তা-ইলিশকে আমরা এমনভাবে উপস্থাপন করেছি যেন এটি ছাড়া বৈশাখ অসম্পূর্ণ। অথচ ঐতিহাসিকভাবে পান্তার সাথে ইলিশের সম্পর্ক এতটা দৃঢ় ছিল না। গ্রামবাংলায় পান্তা খাওয়া হতো মূলত সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে। তখন কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ডাল ভর্তা, আলু ভর্তা কিংবা ছোট মাছ। ইলিশ ছিল ঋতুভিত্তিক একটি মাছ, প্রতিদিনের খাদ্য নয়।
কিন্তু আধুনিক নগরজীবনে, বিশেষ করে গণমাধ্যম ও কর্পোরেট সংস্কৃতির প্রভাবে, পান্তা-ইলিশ এক ধরনের ‘আইকন’ হয়ে উঠেছে। রেস্টুরেন্টগুলোতে বৈশাখী প্যাকেজ, কর্পোরেট অফিসে বিশেষ আয়োজন সবকিছু মিলিয়ে এটি এক ধরনের ব্র্যান্ডেড উৎসবে রূপ নিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষও এই ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে নানা কারণ। প্রথমত, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইলিশের প্রাকৃতিক উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে। দ্বিতীয়ত, অবৈধভাবে জাটকা নিধন ও অতিরিক্ত আহরণ ইলিশের সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, বাজারে সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ইলিশের দামকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে তুলছে। ফলে উৎপাদন কম, চাহিদা বেশি, এই অর্থনৈতিক সূত্র অনুযায়ী ইলিশের দাম আকাশচুম্বী হওয়াটাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, আমাদের সমাজে একধরনের প্রতীকী ভোগ সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে পান্তা-ইলিশ না হলে যেন বৈশাখ উদযাপনই অসম্পূর্ণ। এই ধারণাটি মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে বেশি প্রবল। অথচ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যে পান্তার সাথে ইলিশের কোনো বাধ্যতামূলক সম্পর্ক ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে সরপুঁটির আগমন একদিকে যেমন বাস্তবতার স্বীকৃতি, অন্যদিকে এটি ঐতিহ্যের নতুন ব্যাখ্যা। সরপুঁটি হয়তো ইলিশের মতো স্বাদ বা মর্যাদা বহন করে না, কিন্তু এটি স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য, সস্তা এবং পুষ্টিকর। তাই ইলিশের বিকল্প হিসেবে সরপুঁটির ব্যবহারকে একেবারে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। বরং এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঐতিহ্য মানে শুধু নির্দিষ্ট কোনো খাদ্য নয়, বরং সেই উৎসবের আনন্দ ও সামষ্টিক অংশগ্রহণই আসল।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় তা হচ্ছে মানুষে মানুষে চরম আয় বৈষম্য। একদিকে একটি শ্রেণি হাজার হাজার টাকা খরচ করে ইলিশ কিনে বৈশাখ উদযাপন করছে, অন্যদিকে আরেকটি বড় অংশের মানুষের পক্ষে পান্তার সাথে একটি সাধারণ মাছও জোটানো কঠিন। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সাংস্কৃতিক বিভাজনও তৈরি করছে। ফলে বৈশাখের মতো একটি সর্বজনীন উৎসব ধীরে ধীরে শ্রেণিভিত্তিক হয়ে পড়ছে।
এই বাস্তবতায় ‘ইলিশ নেই, সরপুঁটি আছে’ একটি প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উৎসবের আনন্দ নির্ভর করে না ব্যয়বহুল খাদ্যের ওপর, বরং নির্ভর করে আন্তরিকতা, অংশগ্রহণ এবং সাম্যের ওপর। যদি একটি আয়োজন সরপুঁটি দিয়ে হলেও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটিই প্রকৃত বৈশাখী চেতনার প্রতিফলন।
পহেলা বৈশাখের আগমনী বার্তা মানেই বাঙালির হৃদয়ে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস। নতুন বছরের প্রথম দিনটি উদযাপনে পান্তা-ভর্তা আর ইলিশ ভাজার যে সাংস্কৃতিক প্রতীক গড়ে উঠেছে, তা এখন প্রায় এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। কিন্তু সময়ের নির্মম বাস্তবতা আমাদের সামনে এক নতুন বাক্য হাজির করেছে যা বর্তমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, বাজার ব্যবস্থার অসংগতি এবং খাদ্যসংস্কৃতির পরিবর্তনের এক গভীর প্রতিচ্ছবি।
একসময় যে ইলিশ ছিল নদীমাতৃক বাংলার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে, আজ সেটিই হয়ে উঠেছে বিলাসবহুল পণ্য। রাজধানীর সুপারমার্কেটগুলোতে বরফে মোড়া চকচকে ইলিশ যেন আর মাছ নয়, এক ধরনের ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’। দাম শুনলেই সাধারণ ক্রেতার চোখ কপালে ওঠে। কয়েক হাজার টাকার নিচে ভালো মানের ইলিশ পাওয়া যেন অলীক কল্পনা। ফলে ইলিশ এখন আর সর্বজনীন খাদ্য নয়, বরং বিত্তশালীদের রসনার একচেটিয়া সম্পদে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রাকৃতিক কারণ নদীর পানি কমে যাওয়া, দূষণ বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
দ্বিতীয়ত, মানবসৃষ্ট সংকট জাটকা নিধন, অবৈধ জাল ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত আহরণ ইলিশের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সিন্ডিকেটের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ফলাফল হচ্ছে, ইলিশ এখন ‘প্রিমিয়াম পণ্য’। যেমন উন্নত দেশগুলোতে নির্দিষ্ট কিছু খাদ্যপণ্য কেবল ধনীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকে, তেমনি আমাদের দেশেও ইলিশ ধীরে ধীরে সেই কাতারে চলে যাচ্ছে। সুপারমার্কেটের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচের ভেতরে সাজানো ইলিশ যেন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে এক বিলাসবহুল প্রদর্শনী।
এই প্রেক্ষাপটে সরপুঁটি-র উপস্থিতি একদিকে বাস্তবতার প্রতীক, অন্যদিকে এটি এক ধরনের সামাজিক বার্তাও বহন করে। সরপুঁটি হয়তো ইলিশের মতো ব্র্যান্ডেড নয়, কিন্তু এটি সহজলভ্য, সস্তা এবং পুষ্টিকর। তাই পান্তার সাথে সরপুঁটি পরিবেশন কোনোভাবে ঐতিহ্যের অবমাননার বিষয় নয়
বরং এটি আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে বাস্তবতার সমন্বয়।
ইলিশ নেই, সরপুঁটি আছে স্যার, এই উক্তিটি তাই এক ধরনের নীরব প্রতিবাদ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উৎসবের মূল সুর হওয়া উচিত সাম্য, অংশগ্রহণ এবং আনন্দ; বিলাসিতা নয়। যদি একটি আয়োজন কম খরচে হলেও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটিই প্রকৃত উৎসব।
তবে এই বাস্তবতা মেনে নেওয়ার পাশাপাশি আমাদের দায়িত্বও রয়েছে। ইলিশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাটকা নিধন বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, নদীর দূষণ রোধ, প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ, এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একইসাথে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে, যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো না যায়।
সরকারি নীতিনির্ধারকদের জন্যও এখানে কিছু ভাবনার জায়গা রয়েছে। ইলিশ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ, জাটকা নিধন বন্ধে কঠোর নজরদারি, নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসাথে, বিকল্প মাছের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে উৎসাহ দিলে
সাধারণ মানুষের জন্য সুলভ মূল্যে ইলিশসহ অন্যান্য খাদ্যের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
হয়তো আগামী দিনের বৈশাখে আমরা দেখব, পান্তার সাথে ইলিশের পরিবর্তে নানা ধরনের দেশীয় মাছ, ভর্তা আর গ্রামীণ খাবারের সমাহার। তাতেই ফিরে আসবে আমাদের হারিয়ে যাওয়া শিকড়ের গন্ধ। কারণ, বৈশাখ মানে শুধু ইলিশ খেতে হবে কেন? পহেলা বৈশাখ মানে সেদিন সবার চোখের সামনে চলে আসা বাঙালির চিরন্তন প্রাণের উৎসব।

* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.