
নিজস্ব প্রতিবেদক :
নাটোরের লালপুরে নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুল বলেছেন, অপরাধ দমনে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের পর সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত প্রায় ৩ ঘন্টা ব্যাপী লালপুর উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে নিজ উপজেলায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও জননিরাপত্তা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক কমিটির প্রথম সভায় উপদেষ্টা ও প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সভায় তিনি সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত প্রায় ৩ ঘন্টা ব্যাপী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা শুনেন এবং এ বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
এ সময় তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে তরুণ ও যুব সমাজকে রক্ষার্থে মাদক, সাইবার অপরাধ, কিশোর গ্যাং ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান জোরদারের নির্দেশ দেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, অপরাধ দমনে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। সাধারণ মানুষ যাতে নিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে পারে সে লক্ষ্যে সরকার দৃঢ়ভাবে কাজ করছে সরকার।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভের সভাপতিত্বে সভায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আবীর হোসেন, লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনার রশিদ পাপ্পু, গোপালপুর পৌর বিএনপি সাবেক আহবায়ক ও সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম মোলাম, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও ইউপি চেয়ারম্যান ছিদ্দিক আলী মিস্টু, উপজেলা বিএনপি নেতা হামিদুর রহমান বাবু, ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ রঞ্জু, প্রতিমন্ত্রীর এপিএস মো. আব্দুস সালাম, সহ, উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, বিভিন্ন পর্যাযের জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসনের সদস্য, সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
তাঁরা নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে বিভিন্ন মতামত প্রদান করেন। সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক রাখতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
সভার শুরুতে সভাপতি ইউএনও মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ অবগত করেন, ইতিমধ্যে উপজেলার সকল স্থানের মাদক কেনা-বেচা ও পদ্মানদীতে ইজারার বাইরে যে কোন জায়গা হতে বালি উত্তোলন- অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ, নারী নির্যাতন রোধ, ইমো হ্যাকিং ও অবৈধভাবে জ্বালানী তেল মজুদ বা সরকার নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্যে তেল বিক্রি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
সভায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. মুনজুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও সে মোতাবেক জনবল, যন্ত্রাদি ও সুযোগ-সুবিধা নেই। ৫০ শয্যার ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী পাওয়া যায় না। প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ জন রোগীকে সেবা দেওয়া হয়। এখানে রোগীদের ৩৩ প্রকার পরীক্ষা সেবা দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত এক্সরে ফিল্মসহ সেবার মানোন্নয়নের জন্য আরও কিছু পরীক্ষা সরঞ্জামাদি প্রয়োজন। প্রতিমন্ত্রী রোগীদের সেবা নিশ্চত করতে প্রয়োজনীয় সকল চাহিদার তালিকাসহ প্রতিবেদন দাখিলে নির্দেশ দেন।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছা. শাহিনা সুলতানা বলেন, আইজিএ প্রকল্পের কার্যক্রম আবারও শুরু হচ্ছে। এবার দুটি ট্রেডে (প্রতি ট্রেডে ২০ জন করে) ৩ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রশিক্ষণ পরবর্তী কি ফলাফল পাচ্ছে এবং এই প্রশিক্ষণের আউটপুট কি এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা আগামী ২ কার্যদিবসের মধ্যে প্রস্তুত করে তার বরাবর দাখিলের নির্দেশনা দেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রতিমন্ত্রী তথ্য আপা প্রকল্পের বিষয়ে উপজেলা তথ্যসেবা কর্মকর্তা শুকরানা আশরাফী বলেন, তাদের প্রকল্প আগামী দুই বছর বর্ধিত করার বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পরবর্তীতে এ প্রকল্প রাজস্ব খাতে নেওয়া হবে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহনে তাদের বেতন কেন কর্তন করা হয় এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. নাজমুল খাঁ জানান, উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের মোট ডাটা ৮১৯ টি, ভাতা প্রাপ্ত ৩৬৯ টি, অপেক্ষমাণ ২৫ টি যাদের ভাতার অন্তর্ভূক্ত করা যাবে। কারণ ৩৫ টি অতিরিক্ত বরাদ্দ আসছে। অধিদপ্তর থেকে ৪২৫ টি ডাটা নিস্ক্রীয় তালিকায় নেওয়া হয়েছে। মোট ৪৫ জনকে অধিকতর যাচাই করে দেখা গেছে তাদের ভাতার আওতায় নেওয়া যাবে না সে ক্ষেত্রে তাদের পেরোল আপাততে বন্ধ করা হবে। প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশনা দেন।
যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডেপুটি কো অর্ডিনেটর মো. ইকবাল মাহমুদ জানান, যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশাসনিক ভবন, গরুর সেড, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং অন্যান্য সকল ভবন প্রাক্কলন অনুযায়ী মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আগামী ১৫ এপ্রিল রাত ৯ টার পরে তার সাথে সাক্ষাৎ করে প্রাক্কলন কাজের বিস্তারিত উপস্থাপনের নির্দেশনা দেন।
গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের উপজেলা কো-অর্ডিনেটর মো. হাসান উদ্দৌলা শরাফী বলেন, উপজেলার গ্রাম আদালতের কার্যক্রমের অগ্রগতি হতাশাজনক। গত মাসে মামলা নিষ্পত্তির হার ৩১%। অথচ এ গ্রাম আদালতের কার্যক্রম গতিশীল হলে জনগণকে অভিযোগ মামলা নিয়ে জেলায় যেতে হবে না। এতে একদিকে তাদের ভোগান্তি কমবে অন্যদিকে অর্থ সাশ্রয় হবে।
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অনেক মানুষ এখনও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত নয়। এজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে আলোচনা করে পৌরসভা ব্যতীত লালপুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে গ্রাম আদালতের সার্বিক কার্যক্রমের সুযোগ-সুবিধা বিষয়ে উঠান বৈঠক বা সেমিনার আয়োজনের বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপেন্দ্র নাথ সাহা বলেন, বৈষ্ণব ফকির চাঁদ গোঁসাই আশ্রমের ৪৮ বিঘা জমি রয়েছে। কমিটির দ্বন্দ্বে আশ্রমের বেহাল দশা। দীর্ঘদিন যাবৎ আশ্রমটির আয়-ব্যয়ের কোন তথ্য নেই।
এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বর্তমান এবং পূর্বের সকল কমিটি বিলুপ্ত করার নির্দেশনা দেন। সেই সাথে ইউএনও-ওসির সমন্বয়ে ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে এ পর্যন্ত আশ্রমটি কারা, কিভাবে পরিচালনা করেছেন, কার কি অভাব অভিযোগ আছে এবং আশ্রমের যাবতীয় সম্পদের বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন অবগত করার জন্য বলেন।
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এ ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিম বলেন, উপজেলায় এ বছর ৩৫ টি ট্রান্সফর্মার চুরি হয়েছে। ফলে কৃষকেরা প্রায় অসহায় হয়ে পড়ছে, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে মিটার চুরিও বেড়ে গেছে। মিটার চুরি করে বিকাশ নাম্বার দিয়ে বলে টাকা দিলে মিটার ফেরত দিবে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী ওসি-ডিজিএম সমন্বয়ে ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশনা দেন।
গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহবায়ক ও সাবেক মেয়র মো. নজরুল ইসলাম মোলাম বলেন, গোপালপুর বাজারে গুড়পট্টির সাথে একটি মদভাটি আছে। এখানে এলাকার ছাড়াও বাহির হতে প্রচুর লোক আসে। মাঝে-মধ্যেই ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকে। গোপালপুর পৌরসভার ১৮টি মহল্লার প্রায় প্রত্যেকটিতেই মাদক বিক্রি ও সেবন হয়। বিশেষ করে বিজয়পুর সবজিপাড়ায় অবাধে মাদক কেনাবেচা ও সেবন হয়। প্রতিমন্ত্রী মাদক বিক্রি ও সেবক বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য ওসিকে নির্দেশনা দেন।
প্রতিমন্ত্রীর সকল উন্নয়ন মূলক কাজে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দৈনিক প্রাপ্তি প্রসঙ্গ পত্রিকার সম্পাদক অধ্যক্ষ ইমাম হাসান মুক্তি বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে ফেসবুকে যে অপপ্রচার চলছে। যার সাথে অপসাংবাদিকরাও জড়িত। তিনি এ বিষয়ে গুরুত্ব না দেওয়ার অনুরোধ করেন।
সাংবাদিক মো. শাহ আলম সেলিম বলেন, গোপালপুরে মাঝে মধ্যেই খুনের ঘটনা ঘটে। একটি পুলিশ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে তিনি অনুরোধ করলে প্রতিমন্ত্রী অভিযোগ লিখিত আকারে জানানোর নির্দেশনা দেন।
লালপুর থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, উপজেলার সার্বিক আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি আগে তুলনায় ভালো রয়েছে। মাদকের বিষয়ে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। শুধু মামলা করে মাদক নির্মুল করা সম্ভব নয়। এর জন্য এলাকার জনগণ এবং সন্তানের অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী যেকোন অপরাধ এবং মাদকের বিষয়ে ওসিকে তথ্য দিলে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে অবহিত করেন।