শনিবার | ২ মে, ২০২৬ | ১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩

গাজার মতো হুমকি দিয়ে ইরানকে দমানো কঠিন

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং তার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া আবারও প্রমাণ করেছে সামরিক শক্তির প্রদর্শন দিয়ে দুর্বল ভূখণ্ডকে চাপে রাখা সম্ভব হলেও একই কৌশল সব জায়গায় কার্যকর হয় না। বিশেষ করে ইরানের মতো একটি আঞ্চলিক শক্তির ক্ষেত্রে গাজার মতো হুমকি দিয়ে, ইসরায়েলকে লেলিয়ে দিয়ে অথবা সর্বচ্চো সামরিক শক্তি প্রয়োগ করেও মোটেও কাজ হচ্ছে না এবং জ্বালানী সম্পদ ধ্বংসের মতো হঠকারী কাজগুলো মোটেও বাস্তবসম্মত হচ্ছে না। এসব হুমকি গোটা বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গাজা উপত্যকা, যা মূলত হামাস-এর নিয়ন্ত্রণে একটি সীমাবদ্ধ ভৌগোলিক এলাকা। এর সামরিক সক্ষমতা সীমিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। ফলে ইসরায়েল বহুবার সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে কৌশলগত সুবিধা অর্জন করেছে। কিন্তু ইরান সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। এটি একটি বৃহৎ, সুসংগঠিত রাষ্ট্র, যার রয়েছে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং সুদূরপ্রসারী আঞ্চলিক প্রভাব।
ইরানের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি শুধু তার প্রচলিত বাহিনী নয়, বরং তার কৌশলগত নেটওয়ার্ক।
ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। এটি বিদেশেও বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে থাকে। লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী, ইরাক ও সিরিয়ায় বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া, সব মিলিয়ে ইরান একটি ‘প্রক্সি আর্ক’ তৈরি করেছে, যা তাকে সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দিচ্ছে।
এই বাস্তবতায়, গাজার মতো সরাসরি সামরিক হুমকি দিয়ে ইরানকে দমানো কঠিন হওয়ার প্রথম কারণ হলো, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইরানের প্রবল প্রতিরোধ ক্ষমতা। ইরান শুধু আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে নেই বরং আক্রমণের জবাব দেওয়ার সক্ষমতা তার রয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যে অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত, যা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জন্যও হুমকি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের কৌশলগত ধৈর্য এবং ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধনীতি’ তাকে আলাদা অবস্থানে রেখেছে। সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বদলে ইরান ছোট ছোট আঘাত, সাইবার হামলা, নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে। ফলে কোনো রাষ্ট্র যদি সরাসরি সামরিক হুমকি দেয়, ইরান সেটিকে বিভিন্ন ফ্রন্টে ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
তৃতীয়ত, ভৌগোলিক ও কৌশলগত বাস্তবতা। গাজা একটি ছোট ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, যা সহজেই অবরুদ্ধ করা যায়। কিন্তু ইরান একটি বিশাল দেশ, যার ভূপ্রকৃতি বৈচিত্র্যময় এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও জটিল। সরাসরি সামরিক অভিযান সেখানে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ যা কোনো রাষ্ট্র সহজে মাথায় নিতে চাইবে না।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিলেও রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া, স্পেন ও চীন অনেক ক্ষেত্রে ইরানের পাশে থাকে। ফলে কোনো একক শক্তির জন্য ইরানকে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পঞ্চমত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা। ইরানের শাসনব্যবস্থা বহুমাত্রিক হলেও সেখানে জাতীয়তাবাদী চেতনা শক্তিশালী। বাইরের হুমকি বা চাপ প্রায়ই জনগণকে শাসকদের পক্ষে একত্রিত করে। ফলে সামরিক হুমকি দিয়ে শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার কৌশল অনেক সময় উল্টো ফল দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে, গাজার সঙ্গে ইরানের তুলনা করা একটি বড় কৌশলগত ভুল। গাজা একটি সংকটপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে সামরিক শক্তির দ্রুত প্রয়োগে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ইরান একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র, যার বিরুদ্ধে একই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে তা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
সুতরাং, ইরানকে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন বহুমাত্রিক কৌশল, যেখানে কূটনীতি, অর্থনৈতিক নীতি এবং আঞ্চলিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শুধু হুমকি বা শক্তি প্রয়োগ নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে আলোচনার পথই হতে পারে টেকসই সমাধান।
এদিকে যুদ্ধ শুরু হবার দুই মাস পেরিয়ে গেল। গাজার মতো হুমকি দিয়ে ইরানকে দমাতে না পেরে বার বার মত পাল্টিয়ে পিছু হটছেন ট্রাম্প। এক হরমুজ প্রণালীর অবরোধে ইরানের নিকট ধরাশায়ী হয়েছে ট্রাম্পের যুদ্ধ কৌশল। আবার নিজেই বলছেন তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতে গেছেন!
মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ প্রায়ই শক্তি প্রয়োগের হুমকি, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক চাপের এক জটিল মিশ্রণ হিসেবে দেখা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল ছিল ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি। গাজার মতো কড়া হুমকি ও সামরিক ভাষা ব্যবহার করেও কেন ইরানকে দমাতে পারছেন না ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত কেন তাঁকে বার বার মত পরিবর্তন করতে হচ্ছে তা নিয়ে বিশ্লেষকগণও অনেকটা বিস্মিত।
ট্রাম্প প্রশাসনের ইরাননীতি শুরু থেকেই ছিল আক্রমণাত্মক। ২০১৮ সালে তিনি একতরফাভাবে ইরান নিউক্লিয়ার ডিল (জিসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনেন। এই চুক্তি ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সীমিত করার বিনিময়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে ট্রাম্প ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন, যা দেশটির অর্থনীতিকে গভীর সংকটে ফেলে।
কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক চাপেই থেমে থাকেননি ট্রাম্প। তাঁর ভাষা ও কৌশলে ছিল সরাসরি সামরিক হুমকির ইঙ্গিত। বিশেষ করে কাশেম সোলাইমানী-কে ২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় হত্যা করা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরমে নিয়ে যায়। এই ঘটনাকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সরাসরি যুদ্ধের সূচনা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু আশঙ্কিত সেই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত হয়নি।
গাজার মতো হুমকি কেন ইরানের ক্ষেত্রে কার্যকর হলো না? প্রথমত, ইরান গাজা নয়। গাজার মতো হুমকি দিয়ে ইরানকে দমানো সম্ভব হয়নি, কারণ বাস্তবতা ভিন্ন। এছাড়া ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং হিজবুল্লাহ, হুথি বিদ্রোহীদের মতো মিত্রদের মাধ্যমে ইরান পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একটি প্রভাববলয় গড়ে তুলেছে।
ইরানের কৌশল হচ্ছে ধৈর্য ও পাল্টা প্রতিরোধ। সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে তারা ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধনীতি’ ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ, সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট আঘাত, সাইবার হামলা, এবং প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে চাপ সৃষ্টি করা। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য ইরানকে একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধে পরাস্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন যদিও শক্ত অবস্থান নিয়েছিল, কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের ক্লান্তি তখনও মার্কিন জনগণের মধ্যে বিদ্যমান। ফলে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেও বাস্তবে যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল।
সবশেষে, ট্রাম্পের ‘হুমকি-কেন্দ্রিক’ কৌশল ইরানের ক্ষেত্রে উল্টো ফল দিচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপ ইরানের জনগণকে কষ্ট দিলেও শাসকগোষ্ঠীর অবস্থান দুর্বল করার বদলে অনেক ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী মনোভাবকে শক্তিশালী করে। ফলে ইরান আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইরানের ক্ষেত্রে তাঁর লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হন। তিনি ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা হয়নি। বরং উত্তেজনা বেড়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি আরও এগিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
আমরা জানি বাহ্যিক শক্তির প্রদর্শন সবসময় কার্যকর হয় না, বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ সমানভাবে প্রতিরোধে সক্ষম এবং কৌশলগতভাবে প্রস্তুত থাকে তখন প্রায়শই: উল্টোটা ঘটতে দেখা যায়। ইরানের সাথে তিন সপ্তাহের কঠিন যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের সকল মার্কিন ঘাটিতে ইরানের ভয়ংকর আক্রমণ ও বিপুল ক্ষতিসাধন থেকে ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা সেই শিক্ষাই দেয়।
বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা একরৈখিক নয়। প্রতিটি রাষ্ট্র, প্রতিটি সংঘাতের নিজস্ব প্রেক্ষাপট রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপট না বুঝে এক জায়গার কৌশল অন্য জায়গায় প্রয়োগ করলে তা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ইরানের ক্ষেত্রে মার্কিন-ইসরাইলীদের জন্য সেটিই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। গাজার মতো হুমকি দিয়ে ইরানকে দমানো শুধু কঠিন কাজই নয়। এটি মার্কিনী, ইউরোপীয় ও গোটা বিশ্বের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে।
বাস্তবতা হলো হরমুজের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি এখনও ইরানের হাতেই রয়ে গেছে।
এছাড়া যুদ্ধে তেলক্ষেত্র ও শোধনাগারগুলো বোমা মেরে জ্বালিয়ে দেবার ফলে বৈশ্বিক অয়েল শক কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজ ঘরে ও তার মিত্রদেরকেও বিচলিত করে তুলেছে না? ইতোমধ্যে পাকিস্তানের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্পকেই আগেভাগে সাড়া দেয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তার বড় কারণ হচ্ছে, যুদ্ধের বেনিফিট রাশিয়া, চীন ইত্যাদির হাতে চলে যাচ্ছে। সেটা আঁচ করতে পেরে ট্রাম্প প্রশাসন উঠে পড়ে লেগেছেন। তারা বুঝে গেছেন যে গাজার মতো শুধু হুমকি-ধামকি দিয়ে ইরানকে দমানো যাবে না। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যেসহ সারা বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা আনার জন্য বার বার ট্রাম্পের হুমকিকে কেবল হেসে উড়িয়ে না দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। এর সাথে জরুরী প্রয়োজন বাস্তবসম্মত কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার হাতকে সম্প্রসারণ করার জন্য দ্রুত মানবদরদীদেরকে মুখ খুলে এগিয়ে আসা।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.