
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তাক্ত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে অধিকারচেতনার জন্ম হয়েছিল, তা আজও বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের প্রেরণা জোগায়। বাংলাদেশেও এই দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০২৬ সালে নতুন সরকারের জন্য সামনে একটি নতুন কল্যাণমুখী প্রেক্ষাপট ভেবে মে দিবস তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্রে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং একটি গভীর আত্মসমালোচনা ও কার্যকর নীতিনির্ধারণের উপলক্ষ হওয়া উচিত।
উনিশ শতকের শেষভাগে শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী বিশ্বে শ্রমিক শ্রেণির জীবন ছিল অত্যন্ত কঠিন ও অনিরাপদ। দ্রুত শিল্পায়নের ফলে কারখানার সংখ্যা যেমন বেড়েছিল, তেমনি বেড়েছিল শ্রমিকদের ওপর শোষণ ও নির্যাতন। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য হতেন, অথচ মজুরি ছিল খুবই কম এবং কর্মপরিবেশ ছিল অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো ধরনের ছুটি, নিরাপত্তা বা সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা ছিল না। এই অমানবিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ জমতে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের প্রধান দাবি হয়ে ওঠে, আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা ব্যক্তিগত সময়, যা আজকের শ্রম আইন ও মানবাধিকার ধারণার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। ১৮৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও ইউনিয়ন এই দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন শুরু করে। তাদের লক্ষ্য ছিল কর্মঘণ্টা কমিয়ে একটি মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
১৮৮৬ সালের ১ মে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক একযোগে ধর্মঘট ও বিক্ষোভে অংশ নেন। বিশেষ করে শিকাগো শহর ছিল এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। কয়েকদিন ধরে চলা এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ৪ মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যা ইতিহাসে “হে মার্কেট ট্র্যাজেডি” নামে পরিচিত। শান্তিপূর্ণ এই সমাবেশে হঠাৎ একটি বোমা বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন।
এই ঘটনার পর শ্রমিক নেতাদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়, অনেককে গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু এই দমননীতি শ্রমিকদের আন্দোলনকে দমাতে পারেনি; বরং এটি বিশ্বব্যাপী শ্রমিক অধিকার আন্দোলনকে আরও জোরদার করে তোলে। ১৮৮৯ সালে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যাতে ১৮৮৬ সালের এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনা অম্লান থাকে।
সুতরাং, মহান মে দিবস ১৮৮৬ সংঘটিত হয়েছিল মূলত শ্রমিকদের ন্যায্য কর্মঘণ্টা, মানবিক জীবনযাপন এবং শোষণমুক্ত কর্মপরিবেশের দাবিতে। এটি ছিল শ্রমিকদের আত্মমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, যার প্রভাব আজও বিশ্বব্যাপী শ্রমনীতি ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে গভীরভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এ পর্যায়ে মহান মে দিবস ২০২৬ এবং বাংলাদেশের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিএনপি সরকারের করণীয় বিষয় সম্পর্কে কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরা যাক্। আমরা জানি, ১৮৮৬ সালের শিকাগোর প্রেরণা এখনও অনেকটাই অপূরিত রয়ে গেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এই দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ২০২৬ সালে মে দিবসের তাৎপর্যকে একটি গভীর আত্মসমালোচনা ও কার্যকর নীতিনির্ধারণের উপলক্ষ হিসেবে তুলে ধরা উচিত। এজন্য বড় বড় চ্যালেঞ্জগুলো মাথায় রেখে নতুন করে শ্রমকল্যাণ নীতিমালা সাজানো উচিত উচিত।
প্রথমত, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে শ্রমিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তারা এখনও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় পর্যাপ্ত মজুরি পান না। তৈরি পোশাক শিল্প, নির্মাণ খাত, কৃষি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। বিএনপি সরকারের উচিত একটি বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবভিত্তিক মজুরি কমিশন গঠন করা, যা নিয়মিতভাবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় মজুরি নির্ধারণ করবে। শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, কর্মপরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অতীতে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসের মতো দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে শ্রমিক নিরাপত্তা কতটা অবহেলিত। নতুন সরকারের উচিত কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কারখানার নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
তৃতীয়ত, শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও কার্যক্রম পরিচালনার স্বাধীনতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা তাদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগঠিত হতে গেলে বাধার সম্মুখীন হন। বিএনপি সরকারের উচিত এই বাধাগুলো দূর করে শ্রমিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা। এতে শ্রমিক-নিয়োগকর্তা সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং শিল্পক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা আসবে।
চতুর্থত, অসংগঠিত খাতের শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। বাংলাদেশের বিশাল একটি শ্রমশক্তি অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যারা কোনো প্রকার বীমা, পেনশন বা স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নেই। নতুন সরকারের উচিত একটি সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা, যা শ্রমিকদের জীবনের অনিশ্চয়তা কমাবে। এটি দারিদ্র্য বিমোচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পঞ্চমত, নারী শ্রমিকদের বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তারা এখনও বৈষম্যের শিকার হন। সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং কর্মস্থলে হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিএনপি সরকারের উচিত নারী শ্রমিকদের জন্য একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
ষষ্ঠত, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের খাপ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে, যা শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। নতুন সরকারের উচিত শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা, যাতে তারা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জোরদার করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সপ্তমত, শ্রমিকদের জন্য আবাসন ও জীবনমান উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। শহরাঞ্চলে অনেক শ্রমিক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করেন, যা তাদের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিএনপি সরকারের উচিত স্বল্পমূল্যের আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা এবং শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।
অষ্টমত, শ্রমিকদের জন্য কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। অনেক সময় শ্রমিকরা তাদের সমস্যার সমাধান পেতে দীর্ঘসূত্রিতা ও দুর্নীতির শিকার হন। নতুন সরকারের উচিত একটি স্বচ্ছ ও দ্রুত কার্যকর বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে শ্রমিকরা সহজেই তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারবেন।
নবমত, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত করা প্রয়োজন। শ্রমিক অধিকার রক্ষা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে এবং রপ্তানি খাত শক্তিশালী হবে। বিএনপি সরকারের উচিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করা।
দশমত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিভিন্ন সরকার শ্রমিকদের জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন বিএনপি সরকারের উচিত একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং এর অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা। এতে সরকারের প্রতি আস্থা বাড়বে।
মহান মে দিবস শ্রমিক শ্রেণির আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক প্রতীক হলেও ১৮৮৬ সালের শিকাগোর শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে যে চেতনার প্রত্যাশার জন্ম হয়েছিল সেটা ২০২৬ সালের মে দিবসে এসেও সেই ভাবনা এখনো বিস্তর ব্যবধানের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে এর একটি অংশ এখনও প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় এবারের মে দিবসের মৌলিক প্রতিপাদ্য হওয়া উচিত একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রমকল্যাণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রচেষ্টা চালানো।
মহান মে দিবস ২০২৬ নতুন বিএনপি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এর মধ্যে দিয়ে দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়ার। এই দিবসের চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারলে শুধু শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হবে না, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে। অতএব, মে দিবসের শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জবাবদিহিমূলক নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আইএলও প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী একটি ন্যায়ভিত্তিক শ্রমকল্যাণের পথ অনুসরণ করে টেকসই উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারবে বলে বিশ্লেষকগণ মনে করেন।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]