রবিবার | ৩১ মে, ২০২৬ | ১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

শিরোনাম
জাতীয়তাবাদী চেতনার ভেতরে ও বাইরে মৃত্যুঞ্জয়ী জিয়া চামড়া শিল্পের সোনালী দিন ফিরে আসুক জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে লালপুরে ড্যাবের চিকিৎসাসেবা, উপকৃত ৮ শতাধিক মানুষ লালপুরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণা লালপুরে রেলসেতুর নিচে মিলল যুবকের মরদেহ শহরের মোহ ত্যাগ করে পল্লীর শিশুদের সেবায় ডা. আব্দুর রহিম রামিসা হত্যার প্রতিবাদে লালপুরে মানববন্ধন ও র‍্যালি, ধর্ষক-খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি রূপপুর পারমাণবিকের স্বপ্ন থেকে বাস্তব যাত্রা: ড. জাহেদুল হাসানের একান্ত সাক্ষাৎকার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের মাঝে ঈদসামগ্রী বিতরণ

চামড়া শিল্পের সোনালী দিন ফিরে আসুক

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
আজ ২৮ মে, ২০২৬। এ বছরের কোরবানি ঈদ পার হয়ে গেল। দেশীয় পশু দিয়ে মানুষ খুব সহনীয় এবং রাজধানী ঢাকায় ঈদের আগে গরু হাটের শেষ দুদিন খুব কমদামে, কোথাও অর্ধেক দামে পশু কিনে কোরবানি দিয়েছেন। যদিও অনেক খামারীদের লোকসান হওয়ায় মন খারাপ করতে দেখা গেছে।
ঈদের দিন কোরবানির পর আগকার মতো ফড়িয়ারা আর চামড়া কিনতে আসে না। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট সব জায়গায় একই চিত্র। একটি সংবাদ মাধ্যমে এসছে, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের মধ্যম ওয়াহেদপুর এলাকার বাসিন্দা কোরবানিদাতা আবু জাফর বলছিলেন, ‘চামড়া কেনা তো দূরের কথা, সকাল গড়িয়ে বিকেল হলো, তবে কোনো ক্রেতা একটিবার দেখতেও আসেনি। প্রতিবছর কোরবানিতে পশু জবাইয়ের পর চামড়া কেনার জন্য কয়েকটা পার্টি দেখতে আসে, দরদাম করে। কিন্তু এবার কেউ এলো না।’
আগকার দিনে গরু চোরেরা কৃষকের গরু চুরি করে পাটক্ষেতে নিয়ে জবাই করে চামড়া ছিলে নিয়ে মাংস ফেলে চলে যেত। চামড়ার মূল্য বেশী হওয়ায় তারা টাকার লোভে চামড়া খসে নেবার ঘৃণ্য পন্থা অবলম্বন কর চুরি করতো। এখন গরুর মাংসের দাম গগণচুম্বি, কিন্তু চামড়ার কদর নেই। চামড়া ফেলে দেন অনেকে। আকবার কেউ কেউ চামড়াকে মাটি চাপা দিয়ে কবর দিয়ে দেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চামড়া শিল্প একসময় ছিল অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে যে বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ হয়, তা দেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার সক্ষমতা রাখে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, গত কয়েক বছরে এই শিল্প নানা সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। কাঁচা চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সংরক্ষণে অব্যবস্থাপনা, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব, ট্যানারি শিল্পের দুর্বলতা এবং পরিকল্পনার অভাবে চামড়া শিল্প আজ তার গৌরব হারাতে বসেছে। যথাযথ সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু বিপণন নিশ্চিত করা গেলে চামড়া শিল্প আবার দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর তদারকি এবং সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ।
বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে প্রতি বছর প্রায় কোটি পশু জবাই হয়। এসব পশুর চামড়া শুধু ধর্মীয় আনুষঙ্গিক বিষয় নয়; এটি একটি মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ। বিশেষ করে গরুর চামড়া আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো চাহিদাসম্পন্ন। অথচ মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অনিয়মের
কারণে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কোরবানির সময় স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আয়োজন করা যেতে পারে। কীভাবে পশু জবাই করলে চামড়া অক্ষত থাকবে, কীভাবে দ্রুত চামড়া ছাড়াতে হবে এবং কীভাবে প্রাথমিক সংরক্ষণ
করতে হবেএসব বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে হবে। কারণ চামড়া সংগ্রহের প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চামড়া সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো যথাযথভাবে লবণ ব্যবহার করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গরুর চামড়ায় অন্তত ৫ থেকে ৭ কেজি লবণ ব্যবহার করা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ লবণ ব্যবহার করেন না। আবার কেউ কেউ লবণ দিতে দেরি করেন। ফলে দ্রুত পচন শুরু হয় এবং চামড়া নষ্ট হয়ে যায়। তাই সরকারকে কোরবানির আগে পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে অস্থায়ী চামড়া সংরক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে চামড়া জমা রাখার নিরাপদ ব্যবস্থা, লবণ এবং পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা হলে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সহজেই চামড়া সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
চামড়া শিল্পের আরেকটি বড় সংকট হলো সুষ্ঠু বিপণনের অভাব। সরকার প্রতি বছর কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দাম কার্যকর হয় না। মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট চক্র বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে মাদরাসা, এতিমখানা ও সাধারণ মানুষ চামড়ার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। অনেক সময় পরিবহন খরচের চেয়েও কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়।
এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে কঠোর বাজার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। কোরবানির সময় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করা যেতে পারে। কেউ যেন সরকার নির্ধারিত মূল্যের নিচে জোরপূর্বক চামড়া কিনতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করেও চামড়ার বাজার ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অনলাইনভিত্তিক একটি জাতীয় চামড়া বিপণন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতারা সরাসরি যুক্ত হতে পারবেন। এতে বাজারদর স্বচ্ছ থাকবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমে আসবে। একই সঙ্গে চামড়া কোথায় কত দামে বিক্রি হচ্ছে, সে তথ্যও সহজে পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশে কোরবানির চামড়ার বড় অংশ মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোর আয়ের উৎস। কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে। অনেকে চামড়া সংগ্রহ করেও লাভ তো দূরের কথা, ক্ষতির সম্মুখীন হন। তাই তাদের স্বার্থ রক্ষায় আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সরকার চাইলে সমবায় ভিত্তিক ক্রয়কেন্দ্র চালু করতে পারে, যেখানে মাদরাসা ও এতিমখানাগুলো সরাসরি চামড়া বিক্রি করতে পারবে।
চামড়া শিল্পের উন্নয়নে ট্যানারি শিল্পকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করা অত্যন্ত জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন পরিবেশগত মান একটি বড় বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক ট্যানারি এখনও পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে বিদেশি
ক্রেতাদের আস্থা কমে যাচ্ছে।
সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলা। কিন্তু কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় সেই লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। চামড়াজাত পণ্যের ডিজাইন ও গুণগত মান উন্নত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা সহজ হবে। চামড়ার বাজারে আরেকটি বড় সমস্যা হলো সিন্ডিকেট ও দালালচক্রের প্রভাব। অনেক সময় সরকার দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দামে চামড়া বিক্রি হয় না। ফলে এতিমখানা, মাদরাসা ও সাধারণ বিক্রেতারা
ক্ষতির মুখে পড়েন।
দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ালে নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবন সম্ভব হবে। এতে রপ্তানি আয় বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এখন থেকেই একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। এই পরিকল্পনায় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে হবে। এজন্য, ১. প্রতিটি উপজেলায় চামড়া সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন। ২. পর্যাপ্ত লবণ সরবরাহ নিশ্চিত করা; ৩. সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম দাম বাস্তবায়ন; ৪. ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা চালু করা; ৫. ট্যানারি শিল্পে সহজ ঋণ ও প্রযুক্তি সহায়তা প্রদান; ৬. পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত ও রপ্তানি বাজার
সম্প্রসারণে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা দরকার।
বাংলাদেশে কোরবানির ঈদে প্রায় এক কোটির বেশি পশু কোরবানি হয়। এর মধ্যে গরুর চামড়ার পরিমাণই সবচেয়ে বেশি। অথচ এই বিশাল সম্পদ সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারছে না। ফলে কাঁচা চামড়ার দাম কমে যাচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সংগ্রাহক ও সাধারণ মানুষ।
এবারের কোরবানির ঈদের খারাপ অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে এখনই একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। জাতীয়তাবাদী দলকে জাতীয় সম্পদের দিকে বেশী নজর দিতে হবে।
বিএনপি সরকারের কাছে সময়ের দাবি হলো, চামড়া শিল্পকে আবারও দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য সরকার, ব্যবসায়ী, ট্যানারি মালিক, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর তদারকি এবং আন্তরিক উদ্যোগ থাকলে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প অবশ্যই তার সোনালী দিন ফিরে পাবে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.