
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক উত্থান একদিকে বিস্ময়কর, অন্যদিকে বৈপরীত্যে ভরা। বিপুল তেলসম্পদের ওপর ভর করে গড়ে ওঠা আকাশছোঁয়া নগরায়ণ, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং বৈশ্বিক প্রভাব, সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চল যেন আধুনিকতার এক প্রদর্শনী। কিন্তু এই চকচকে বাস্তবতার আড়ালে রয়েছে নিরাপত্তাহীনতার গভীর উদ্বেগ, যা অনেকটা সাপ দিয়ে বসতঘর পাহারা দেয়ার মতোই এক জটিল ও দ্বৈত পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠী যাদের অনেক সময় রূপকভাবে ‘শেখ’ বা রাজতান্ত্রিক এলিট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের জীবনযাপন নিঃসন্দেহে বিলাসিতার চরম উদাহরণ। অট্টালিকা, ব্যক্তিগত জেট, বিলাসবহুল প্রাসাদ এবং বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, সবকিছুই তাদের ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতীক। কিন্তু এই বিলাসী জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তারা যে কৌশল অবলম্বন করেছে, সেটিই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রেই কোনো না কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। এই ঘাঁটিগুলোকে দেখা হয় নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে, বিশেষ করে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে।
কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়। বিষধর সাপস্বরূপ এই ঘাঁটিগুলো যেমন একদিকে বাহ্যিক আক্রমণ প্রতিরোধে সহায়ক, তেমনি অন্যদিকে এগুলো নিজেই নতুন ঝুঁকির উৎস। কোনো আঞ্চলিক সংঘাত তীব্র হলে এই ঘাঁটিগুলোই প্রথম আঘাতের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ফলে যে নিরাপত্তার জন্য এগুলো স্থাপন করা হয়েছিল, সেই নিরাপত্তাই আবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
এখানে একটি মৌলিক চিন্তা উঠে আসে। সেটা হলো, এই পরনির্ভরশীল নিরাপত্তা বলয় তৈরী করা কার জন্য? সাধারণ জনগণের জন্য, নাকি শাসকগোষ্ঠীর বিলাসী জীবন রক্ষার জন্য? অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সামরিক নির্ভরতা মূলত ক্ষমতাসীন এলিটদের স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশল।
কারণ অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ সীমিত থাকায়, বাহ্যিক শক্তির সহায়তা তাদের ক্ষমতাকে আরও স্থিতিশীল করে তোলে।
অন্যদিকে, এই নির্ভরতা সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। একটি দেশের মাটিতে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি থাকা মানেই নীতিনির্ধারণে এক ধরনের অদৃশ্য চাপ কাজ করা। ফলে স্বাধীন কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, নিরাপত্তার বিনিময়ে একটি দেশ তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছুটা ক্ষমতা হারায়।
বাংলা প্রবাদ ‘দুধকলা দিয়ে সাপ পোষা’-র মতো সাপ দিয়ে বসতঘর পাহারা রূপকটি এখানেই সবচেয়ে অর্থবহ। সাপ যেমন চোরকে ভয় দেখাতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে ঘরের মানুষের জন্যও হুমকি। এটি ঠিক তেমনি দ্বৈত চরিত্ত্রের এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলোও এরূপ দ্বৈত চরিত্র বহন করে চলেছে। এমনকি উপসাগরীয় দেশের জনগণ মনে করেন, এগুলো নিরাপত্তার প্রতীক, আবার একই সঙ্গে সম্ভাব্য বিপদের উৎস।
এই বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। কেবল বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং অভ্যন্তরীণ অংশগ্রহণ- এই তিনটির সমন্বয়েই টেকসই নিরাপত্তা গড়ে উঠতে পারে।
মরুপ্রধান উপসাগরীয় অঞ্চলের জীবনযাত্রা বহু দিক থেকেই ব্যতিক্রমী। কঠোর জলবায়ু, সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ (বিশেষত পানি), আর তেলনির্ভর অর্থনীতি, সব মিলিয়ে এই অঞ্চলটি একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তার এক জটিল সমাহার। এই বাস্তবতায় নিরাপত্তা প্রশ্নটি সবসময়ই কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বহন করেছে। বাহ্যিক হুমকি, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সবকিছুর মাঝে দাঁড়িয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো এক ধরনের নিরাপত্তা ছাতার নিচে নিজেদের রক্ষা করতে চেয়েছে। সেই ছাতার নাম অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন সামরিক উপস্থিতি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রধান রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তেলসম্পদের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলে মার্কিন আগ্রহও বৃদ্ধি পায়। উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইত্যাদি দেশ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা জোরদার করে। ফলে সেখানে একের পর এক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হয়।
এই ঘাঁটিগুলো নিঃসন্দেহে কিছু ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছে। আঞ্চলিক সংঘাত, যেমন ইরান-ইরাক যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক নানা উত্তেজনার সময় মার্কিন উপস্থিতি অনেক দেশের জন্য প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলো, যাদের নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা সীমিত, তারা এই বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভর করে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছে।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। নিরাপত্তার নামে এই নির্ভরতা ধীরে ধীরে একটি কৌশলগত ফাঁদে পরিণত হতে পারে। যেমন সাপ ঘরের পাশে থাকলে চোর ঢুকতে ভয় পায়, কিন্তু সেই সাপই একদিন ঘরের বাসিন্দার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ক্ষেত্রেও অনুরূপ আশঙ্কা তৈরি হয়। এই ঘাঁটিগুলো উপসাগরীয় দেশগুলোকে যেমন রক্ষা করে, তেমনি এগুলো আবার ওই দেশগুলোকে সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতেও পরিণত করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, তখন উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলো সম্ভাব্য আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়ে, যদিও তারা সেই সংঘাতের মূল পক্ষ নয়। অর্থাৎ, অন্যের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হতে গিয়ে তারা নিজেরাই অনিরাপত্তার মধ্যে পড়ে যায়।
এছাড়া রয়েছে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। একটি দেশের মাটিতে অন্য দেশের সামরিক ঘাঁটি থাকা মানেই একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়া। নীতি নির্ধারণ, পররাষ্ট্র সম্পর্ক কিংবা প্রতিরক্ষা কৌশলে সেই বাহ্যিক শক্তির প্রভাব অস্বীকার করা কঠিন। ফলে দেশগুলো একধরনের “নিরাপত্তা নির্ভরতা”-র চক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যেখানে নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সংকুচিত হয়।
এই বাস্তবতা শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক নয়, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকেও প্রভাব ফেলে। অনেক সময় স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। সাংস্কৃতিক ভিন্নতা, সামাজিক আচরণ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এই অসন্তোষ বাড়তে পারে। ইতিহাস বলছে, এই ধরনের অসন্তোষ কখনো কখনো সহিংস প্রতিক্রিয়ায়ও রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচ্য। তাদের জন্য ক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তারা অনেক সময় বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভর করে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। কিন্তু এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, বাহ্যিক শক্তির স্বার্থ সবসময় অভ্যন্তরীণ স্বার্থের সঙ্গে মিলবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে এটাও সত্য যে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় সম্পূর্ণ আত্মনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অনেক দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়। বিশেষ করে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি আরও কঠিন। তাই তারা জোট, সহযোগিতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের পথ বেছে নেয়। কিন্তু সেই অংশীদারিত্ব যেন একপাক্ষিক নির্ভরতায় পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
এই ক্রশিয়াল সমস্যা সমাধানের পথ তৈরী করতে হলে প্রথমত, উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা গেলে বাহ্যিক নির্ভরতা কমানো সম্ভব। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। যাতে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি না হয়।
তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও জনগণের আস্থা অর্জন করা, যা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। আর সেজন্যই মনে করা হয় উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো একই সঙ্গে আশীর্বাদ ও বিলাসী শেখদের সাথে সাথে সেসব দেশের জনগণের জন্য বড় অভিশাপের প্রতীক। এছাড়া এই সমস্যা আমাদের দেশের অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের মাধ্যমে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অরর্জন হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবার ক্ষেত্রে বড় হুমকি। এগুলো ছাড়াও শেখরা হয়তো আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, কিন্তু এগুলো থাকার কারণে দেশে দেশে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কুয়েত যুদ্ধ এবং বর্তমান ইরান আমেরিকা- ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট সমস্যাগুলো মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে কেন্দ্র করে আরো বেশী উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
আমরা জানি, নিরাপত্তা কখনোই একমাত্রিক বিষয় নয়। যে কোন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ইত্যাদিও সবসময়ই একটি ভারসাম্যের খেলা। সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারলে পাহারাদারই একসময় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আর তখন সাপ দিয়ে বসতঘর পাহারা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি হয়তো আর কোন নিরাপত্তা দিতে পারবে না। বিশ্বব্যাপী সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে অতীতের মতো সামনের দিনগুলোতেও এই নির্ভরশীল নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি ভয়ংকর আত্মঘাতী কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হতে থাকবে বৈ-কি?
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]