| |

শিরোনাম
প্রেমের ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক ধর্ষণ ও ভিডিও ধারণ, টাকা দাবি লালপুরে ভূমি অফিস-ইউপি কার্যালয়ে আবারও চুরি, ৯ মাসে ৫ দপ্তরে হানা মেয়ে সেজে ইতালি প্রবাসীকে বিয়ে, বাবা – ছেলে আটক বড়াইগ্রামে নিখোঁজের ৫ দিন পর পরিবহন শ্রমিকের লাশ উদ্ধার জাতীয় পর্যায়ে ‘শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক’ নির্বাচিত হয়েছেন সেন্ট যোসেফসের অধ্যক্ষ শংকর ডমিনিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্মেলনে ‘বেস্ট পোস্টার প্রেজেন্টার’ বাউয়েটের শিক্ষার্থী বড়াইগ্রামে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে রূপপুর: অভিযোগের নথিভিত্তিক জবাব দিল এনপিসিবিএল বড়াইগ্রামে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু ঈশ্বরদী সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব

দুনিয়ায় একা ঘুরতে পারব ঢাকায় নয়

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
সেদিন কানাডায় পড়াশুনা শেষ করে ঢাকায় এসে আমার এক নিকটাত্মীয়া হঠাৎ করে বলেই ফেলল, দুনিয়ার সব দেশের রাজধানীতে একা একা ঘুরতে পারব, তবে ঢাকায় নয়। তার এই একটি কথার মধ্যে রাগ, ভীতি বা অহংকার ছিল না। তবে, সে যেটা জানাল তাতে ঢাকার নগর জীবনের বহু বছরের ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা ও নাগরিক বঞ্চনার গল্প লুকিয়ে আছে। ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক রাজধানী। কিন্তু মানুষের হাঁটা, নিরাপদ চলাচল, বিশ্রাম, বিনোদন ও নাগরিক স্বস্তির জন্য শহরটি কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নের উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
দুনিয়ার নানা দেশের রাজধানীতে একা একা ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। প্যারিসে মেট্রো থেকে নেমে অচেনা গলিতে হাঁটা যায়। লন্ডনে গুগল ম্যাপ হাতে নিয়ে রাতেও পথ চলা যায়, টোকিওতে ভাষা না জেনেও রেলস্টেশনের নির্দেশনা অনুসরণ করে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, সিঙ্গাপুরে ফুটপাত ধরে নিশ্চিন্তে হাঁটা যায়। অথচ নিজের দেশের রাজধানী ঢাকায় একা হাঁটার কথা উঠলেই মনে হয়, কোথায় হাঁটব? ফুটপাত কোথায়? রাস্তা পার হব কীভাবে? বাস কখন থামবে? রিকশা কোন দিক থেকে আসবে? মোটরসাইকেল কোন ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবে? হাইজ্যাকার এসে ব্যাগ টেনে নেবে কি-না।
বৃষ্টি হলে রাস্তা ডুবে যাবে কি না? আর সবচেয়ে বড় কথা, এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে কত সময় লাগবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আসলেই রাজধানীর গুলিস্তান থেকে ফার্মগেট হাঁটতে চাইলে পথচারী কোথায়? সকালবেলা গুলিস্তান, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, মহাখালী কিংবা মিরপুরে দাঁড়ালেই শহরের প্রকৃত চিত্র চোখে পড়ে।
গুলিস্তানে ফুটপাত অনেক জায়গায় পথচারীর জন্য না হয়ে দোকান, হকার, পণ্য ওঠানামা এবং নানা ধরনের অস্থায়ী ব্যবহারের জায়গায় পরিণত হয়েছে। ফলে পথচারী ফুটপাত ছেড়ে মূল সড়কের কিনারায় হাঁটতে বাধ্য হন। একটি বাস একটু কাছে এলেই তার সামনে-পেছনে সরে দাঁড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
একজন বৃদ্ধ, শিশু কিংবা শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য পরিস্থিতিটি কতটা বিপজ্জনক, তা সহজেই অনুমেয়।
ফার্মগেটেও একই চিত্রের ভিন্ন সংস্করণ। ব্যস্ত সড়ক, বাসের চাপ, পথচারীর ভিড়, রাস্তা পারাপারের তাড়া এবং ফুটপাতের সীমিত জায়গা সব মিলিয়ে সেখানে হাঁটা অনেক সময় শারীরিক ও মানসিক উভয় পরীক্ষায় পরিণত হয়। কারওয়ান বাজারে আবার সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয় পাইকারি বাজারের মালামাল পরিবহন। দিনের বিভিন্ন সময়ে রাস্তা ও ফুটপাতের ওপর পণ্য ওঠানামা, ট্রাক- পিকআপের চলাচল এবং মানুষের ভিড় পথচারীকে আরও অসহায় করে তোলে।
ঢাকায় ফুটপাত আছে, কিন্তু হাঁটার জায়গা নেই এটাই বড় আক্ষেপের বিষয়। ঢাকার সবচেয়ে বড় নগর- বিদ্রূপগুলোর একটি হলো, কাগজে ফুটপাত আছে, বাস্তবে পথচারীর জন্য তা নেই। কোথাও ফুটপাত দখল করেছে দোকান। কোথাও রেস্তোরাঁর চেয়ার-টেবিল। কোথাও নির্মাণসামগ্রী। কোথাও মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি। কোথাও আবার বৈদ্যুতিক খুঁটি, ম্যানহোল, আবর্জনার স্তূপ কিংবা ভাঙা স্ল্যাব পথ আটকে রেখেছে।
ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ীর বহু এলাকায় কমবেশি একই অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। পথচারীকে ফুটপাতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার সময় বারবার বাধা অতিক্রম করতে হয়। আর এই বাধা অতিক্রমের সবচেয়ে সহজ উপায় হয়ে দাঁড়ায় রাস্তার ওপর নেমে যাওয়া। সেখানেই শুরু হয় বিপদ। একজন পথচারী যখন গাড়ির লেনের মধ্যে হাঁটতে বাধ্য হন, তখন চালকের জন্যও ঝুঁকি বাড়ে, পথচারীর জন্যও।
ব্যস্ত যাত্রাবাড়ী ও মহাখালীর বাস্তবতা আরো করুণ। যাত্রাবাড়ী ঢাকার প্রবেশদ্বারগুলোর অন্যতম। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ ও বের হন। এখানে দূরপাল্লার বাস, নগর পরিবহন, ট্রাক, পিকআপ, সিএনজি, রিকশা, মোটরসাইকেল ও পথচারীর বহুমুখী চলাচল নগর ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
মহাখালীতেও আন্তঃজেলা ও নগর পরিবহনের চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হাসপাতাল, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার মানুষের চলাচল। এখানে ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা ও পথচারী একই জায়গা ব্যবহার করে।
আর বাড্ডা-রামপুরা যেন প্রতিদিনের যুদ্ধক্ষেত্র। বাড্ডা-রামপুরা করিডোরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে যানজট, সড়ক সংকীর্ণতা, গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা ও পথচারী চলাচলের সমস্যার সঙ্গে পরিচিত।
একজন কর্মজীবী মানুষের অফিসে পৌঁছানোর সময় অনিশ্চিত, শিক্ষার্থীর ক্লাস মিস হয়, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয়, একজন মা শিশুকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনে বসে থাকেন।
অর্থাৎ যানজটের অর্থনৈতিক মূল্য যেমন আছে, তেমনি এর সামাজিক মূল্যও আছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শহরের দিকে আসার প্রধান সড়কটি রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। দেশের অতিথিরা প্রথম যে নগরচিত্রটি দেখেন, তার একটি বড় অংশ এই সড়ক ঘিরে। একজন বিদেশি পর্যটক বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যদি গণপরিবহন ব্যবহার করতে চান, তাকে প্রথমেই বুঝতে হয়, কোথায় দাঁড়াবেন, কোথা থেকে বাস পাবেন, কোথায় রাস্তা পার হবেন।
পৃথিবীর অনেক রাজধানীতে বিমানবন্দর থেকে শহরে প্রবেশ একটি সুপরিকল্পিত যাত্রার অংশ। ঢাকায় সেটি অনেক সময় একটি অভিযানের মতো।
পুরান ঢাকায় নগরজীবন আরও জটিল। সরু রাস্তা, ঘনবসতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের চাপ নিয়ে চকবাজার, ইসলামপুর, সদরঘাটসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একজন পথচারীকে প্রায়ই একই রাস্তা দোকানদার, ক্রেতা, রিকশা, পণ্যবাহী যান ও অন্যান্য ব্যবহারকারীর সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়।
বৃষ্টির দিনে ঢাকায় চলা আরও কঠিন। ঢাকার নাগরিক দুর্ভোগের আরেকটি বড় অধ্যায় হলো জলাবদ্ধতা, এডিসমশা, ডেঙ্গুজ্বর। বর্ষায় কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমে যায়। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা বা নর্দমার অবস্থান বোঝা যায় না, কোথাও যানবাহনের ঢেউয়ে পথচারীর কাপড় ভিজে যায়।
আমার সেই আত্মীয়ার ভাবনা ছিল, মেট্রোরেল এসেছে কিন্তু শেষ এক কিলোমিটার কিভাবে চলবো?
ঢাকায় মেট্রোরেল নিঃসন্দেহে নগর পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু একটি মেট্রো স্টেশনে পৌঁছানো এবং স্টেশন থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো, এই ‘first mile’ ও ‘last mile’ সমস্যা সমাধান না হলে গণপরিবহন ব্যবস্থার পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন। ধরা যাক, একজন যাত্রী মেট্রোরেলে আগারগাঁও থেকে মতিঝিল গেলেন। কিন্তু তার বাড়ি বা অফিস যদি স্টেশন থেকে এক-দুই কিলোমিটার দূরে হয়, তাহলে তিনি কীভাবে যাবেন? অর্থাৎ একটি ভালো মেট্রোরেল ব্যবস্থা তখনই পূর্ণাঙ্গ গণপরিবহন ব্যবস্থা হবে, যখন তার সঙ্গে নিরাপদ হাঁটা, সাইকেল, বাস ও অন্যান্য স্থানীয় পরিবহনের সমন্বিত সংযোগ থাকবে।
ঢাকার সবচেয়ে অবহেলিত নাগরিক হলো পথচারী। ঢাকার নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে গাড়ি ও সড়ককে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শহরের অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল সরাসরি হাঁটার সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বব্যাংকের নগর পরিবহন বিশ্লেষণেও ঢাকার বিপুল সংখ্যক মানুষের হাঁটা ও অ-মোটরচালিত পরিবহনের ওপর নির্ভরতার কথা উঠে এসেছে। অথচ পর্যাপ্ত ফুটপাত ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। ফলে শহরের সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী হয়েও পথচারী সবচেয়ে কম ক্ষমতাবান। এটি পরিবর্তন করতে হবে।
নারী ও শিশুর জন্য ঢাকা কতটা নিরাপদ? একজন পুরুষ দ্রুত রাস্তা পার হয়ে হয়তো কোনোভাবে পরিস্থিতি সামলে নিতে পারেন। কিন্তু একজন নারী যখন ব্যাগ হাতে, সঙ্গে শিশু নিয়ে ব্যস্ত রাস্তা পার হন, তখন তার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন মা শিশুকে নিয়ে ফুটপাত থেকে রাস্তার মধ্যে নামতে বাধ্য হলে ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়ে। একজন প্রবীণ মানুষ ভাঙা ফুটপাতের কারণে হোঁচট খেতে পারেন। একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী হয়তো ফুটপাতেই উঠতে পারবেন না।
রাজধানীর এসব সমস্যার সমাধান করা এবং ঢাকাকে মানুষের শহর করতে হলে নতুন কিছু সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। প্রথমত, ফুটপাতকে সত্যিকার অর্থে পথচারীর জন্য ফিরিয়ে দিতে হবে। দখলমুক্ত করার পর আবার দখল হবে, এমন চক্র বন্ধ করতে স্থায়ী ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ফুটপাতের মাঝখানে বৈদ্যুতিক খুঁটি, দোকান, সিঁড়ি বা উঁচু-নিচু অংশ রেখে ফুটপাত চলবে না। তৃতীয়ত, সব ব্যস্ত এলাকায় নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং, এআই পথচারী সিগন্যাল ও প্রয়োজনীয় ট্রাফিক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। চতুর্থত, যেখানে-সেখানে অটো, বাস থামার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। পঞ্চমত, রাস্তার পাশে একটি গাড়ি যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটপাত বা সড়কের অংশ দখল করে রাখে, তাহলে সেই জায়গার প্রকৃত মালিকানা কার? ষষ্ঠত, মেট্রোরেল, বাস, রিকশা, হাঁটা ও সাইকেল, সবকিছুকে একই পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। ঢাকা শহরের প্রশাসনিক বিভাজন ও বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বের সমন্বয় করতে হবে। সড়ক, ফুটপাত, ড্রেন, ট্রাফিক, গণপরিবহন ও নগর উন্নয়ন আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তে পরিচালিত হলে সমন্বিত নগর তৈরি করা সম্ভব নয়।
ঢাকার সৌন্দর্য হবে তখনই, যখন একজন নাগরিক কোনো বাধা ছাড়াই এক কিলোমিটার হাঁটতে পারবেন। যখন একজন শিশু বাবা-মায়ের হাত ধরে নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারবে। যখন একজন নারী সন্ধ্যায় গণপরিবহন থেকে নেমে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারবেন। যখন একজন প্রবীণ কিংবা প্রতিবন্ধী নাগরিক অন্যের সাহায্য ছাড়া শহরের ফুটপাত ব্যবহার করতে পারবেন। তখনই ঢাকা সত্যিকার অর্থে নাগরিকবান্ধব রাজধানী হয়ে উঠবে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.