| |

সিসি ক্যামেরার নজরদারি, কবুতরের ঘরে আস্তানা; ওহিদুলের হ্যাকিং ও মাদক সাম্রাজ্যের সহযোগী পুলিশ কনস্টেবল

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :

বাড়ির চারপাশে কড়া নিরাপত্তা। গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে বাড়ি পর্যন্ত বসানো ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। ঘরের ভেতরে সারাক্ষণ নজর রাখার জন্য সিসিটিভি মনিটর। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই—কবুতরের ঘরের আড়ালে মানুষের থাকার ব্যবস্থা। সেখানে খাট, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ ছিল নানা সুবিধা। হ্যাকিংয়ের কাজে ব্যবহার করতেন সাতটি মুঠোফোন ও ৬৮টি সিম কার্ড। পুলিশের অভিযান টের পেলেই যাতে পালিয়ে যেতে পারেন, ছিল সেই ব্যবস্থাও। কিন্তু এত আয়োজন করেও শেষ রক্ষা হয়নি কথিত ‘হ্যাকিং সম্রাট’ ওহিদুল মোল্লা ওরফে ওহিদের।

নাটোরের লালপুরে হ্যাকিং কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসার অভিযোগে ওহিদুল মোল্লাসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে আলামিন (২৩) নামের একজন পুলিশ কনস্টেবলও রয়েছেন। তিনি রাজশাহী রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) কনস্টেবল। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাতে তাঁদের লালপুর আমলী আদালতে হাজির করা হলে বিচারক সাদ্দাম হোসেন সবাইকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রাত ৯টার দিকে তাঁদের নাটোর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

রাজমিস্ত্রি থেকে ‘হ্যাকিং সম্রাট’

জানা যায়, ওহিদুল মোল্লা (৩২) উপজেলার মোহরকয়া গ্রামের মৃত রব্বেল মোল্লার ছেলে। মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান ওহিদুল প্রায় পাঁচ বছর আগেও রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। পরে কিছুদিন ইজিবাইক চালিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আগে চুরির অভিযোগে কয়েকবার আটক হওয়ার তথ্যও রয়েছে।

পুলিশের দাবি, সময়ের সঙ্গে হ্যাকিং ও ডিজিটাল প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েন ওহিদুল। বিলমাড়িয়া বাজারসংলগ্ন নদীর ধারে নতুন একটি বাড়িতে তিনি হ্যাকিং ও মাদক ব্যবসার কার্যক্রম চালাতেন। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে তিনি দুটি বাড়ি করেছেন বলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। বাড়ি দুটির চারপাশেই রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারি ব্যবস্থা।

লালপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, বিলমাড়িয়া এলাকায় ওহিদুলকে হ্যাকিং চক্রের ‘গুরু’ হিসেবে মানতেন তাঁর সহযোগীরা। তাঁর নেতৃত্বে এলাকায় একটি হ্যাকিং চক্র গড়ে ওঠার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

কবুতরের ঘরের আড়ালে ‘নিরাপদ’ আস্তানা
থানা সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তার এড়াতে ওহিদুল তাঁর বাড়ির নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। গ্রামের প্রধান সড়ক থেকে বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। ফলে অপরিচিত কেউ এলাকায় প্রবেশ করলেই তার গতিবিধি নজরে আসত।
আরও চমকপ্রদ ছিল তাঁর থাকার ব্যবস্থা। বাড়ির একটি কক্ষে কয়েক শ কবুতর রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেই ঘরের মধ্যেই তৈরি করা হয়েছিল একটি বিছানা। সেখানে ছিল সিসিটিভি মনিটর, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও অন্যান্য আসবাব। বাইরে থেকে দেখলে সেটিকে মানুষের থাকার ঘর বলে বোঝার উপায় ছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ।

হ্যাকিংয়ের কাজে সাতটি মুঠোফোন অদলবদল করে ব্যবহার করা হতো ৬৮টি সিম কার্ড। উদ্ধার হওয়া সিমগুলোর নম্বর কাগজে ছক করে রাখা ছিল। কোন সিম কোন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা বোঝাতে বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্নও দেওয়া ছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছে পুলিশ।

প্রবাসীদের টার্গেট করে প্রতারণার অভিযোগ

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে থানা সূত্র জানায়, চক্রটি প্রবাসীদের ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমো অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করত। এরপর তাঁদের দেশে থাকা স্বজনদের টাকা পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হতো।
পুলিশের দাবি, এসব নম্বরের শেষ চারটি ডিজিটের সঙ্গে মিল রেখে নতুন মোবাইল নম্বর তৈরি করা হতো। পরে প্রবাসীদের পরিচিত বিকাশ এজেন্টদের বিভ্রান্ত করে ওই নম্বরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বলা হতো। এভাবে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে।

ওহিদের সঙ্গে গ্রেপ্তার পুলিশ কনস্টেবল
ওহিদুলের বাড়িতে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে অভিযান চালায় লালপুর থানা পুলিশ। অভিযানে ওহিদুলসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ৯টি অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন, ৬৮টি সিম কার্ড, ১০৬টি ইয়াবা, দুটি মোটরসাইকেল ও ৩২ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন আলামিন (২৩)। তিনি উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের পানসিপাড়া গ্রামের আতাহার প্রামাণিকের ছেলে এবং রাজশাহী আরআরএফের কনস্টেবল। গ্রেপ্তারের পর থানায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর তাঁর পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হয় বলে জানিয়েছে থানা পুলিশ।

আলামিনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে হ্যাকিং ও প্রতারণার অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে। ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় ওহিদুল মোল্লা, আলামিন ও মুক্তার আলীর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক মামলা করা হয়েছে।
পানসিপাড়া গ্রামের ইউপি সদস্য আলতাব হোসেন বলেন, আলামিনকে গ্রেপ্তারের কথা তিনি শুনেছেন। তিনি কৃষক পরিবারের সন্তান এবং প্রায় পাঁচ বছর আগে পুলিশে চাকরি পেয়েছেন। তবে আলামিন মাদক ব্যবসা বা হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

ছুটি ছাড়াই বাড়িতে, বিভাগীয় ব্যবস্থা হবে

রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ) রাজশাহীর কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত ডিআইজি) দীন মোহাম্মদ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বলেন, নাটোর জেলা পুলিশের কাছ থেকে আলামিনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। জেলা পুলিশ লিখিতভাবে বিষয়টি জানালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু করা হবে।

তিনি আরও জানান, আলামিন কোনো ছুটি না নিয়েই সোমবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে গিয়েছিলেন বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। ওই রাতেই তিনি পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হন।

এত নজরদারির পরও ধরা পড়লেন
পুলিশের চোখ এড়াতে বাড়ি থেকে প্রধান সড়ক পর্যন্ত সিসিটিভি, হ্যাকিংয়ের জন্য একাধিক মুঠোফোনে ৬৮টি সিম, আলাদা থাকার জায়গা—সবই ছিল ওহিদুলের হ্যাকিং কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার প্রস্তুতির অংশ। এমনকি কবুতরের ঘরের আড়ালে তৈরি করেছিলেন নিজের থাকার ব্যবস্থা।

তবু গভীর রাতে পুলিশের অভিযানে সেই কথিত নিরাপদ আস্তানাই হয়ে উঠল গ্রেপ্তারের স্থান। ওহিদুলের সঙ্গে গ্রেপ্তার হলেন তাঁর কথিত সহযোগীরা। তাঁদের মধ্যে একজন আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য—পুলিশ কনস্টেবল আলামিন।

[উপসম্পাদক / প্রাপ্তি প্রসঙ্গ/ ২৩-০২]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.