| |

শীতের পরশে জেগে উঠছে খেজুরগাছ, লালপুরে গুড়ে ৬৪ কোটি টাকার সম্ভাবনা

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

ভোরের কুয়াশা, ঘাসের ডগায় শিশির আর হিমেল বাতাস—প্রকৃতিতে শীতের আগমনী বার্তা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। ঋতুবদলের এই আবহে নাটোরের লালপুরে খেজুরগাছ ঘিরে বাড়ছে কর্মচাঞ্চল্য। শীতের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও গুড়ের অপেক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন গাছিরা। কেউ গাছের ডালপালা ছেঁটে রস সংগ্রহের উপযোগী করছেন, কেউ লাগাচ্ছেন রস নামানোর নলি ও পাত্র। কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে রস সংগ্রহও। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যস্ততা আরও বাড়বে। আর খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু গুড়, যা গ্রামবাংলার শীতকালীন খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লালপুরে খেজুরের রস ও গুড়ের মৌসুমি ব্যবসাকে ঘিরে রয়েছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। উপজেলা কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩২৫টি খেজুরগাছ রয়েছে। চলতি মৌসুমে এসব গাছ থেকে ৩ হাজার ২১০ দশমিক ৫ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৬৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। ফলে শীতের এই ঐতিহ্য স্থানীয় গাছি ও গুড় উৎপাদনকারীদের জীবিকা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করেছে।

উপজেলার হাঁসবাড়িয়া গ্রামের গাছি ইসমাইল হোসেন (৪২) জানালেন, খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নির্দিষ্ট কৌশলে গাছের অংশবিশেষ ছেঁটে রস নামানোর ব্যবস্থা করতে হয়। এরপর গাছ থেকে সংগ্রহ করা রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় গুড়। তাঁর ভাষায়, শীতের তীব্রতা বাড়লে সাধারণত রস সংগ্রহের পরিবেশও অনুকূল হয়ে ওঠে। তখন গাছিদের ব্যস্ততা বাড়ে, শুরু হয় পুরোদমে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ।

কৃষ্ণরামপুর গ্রামের গাছি নজরুল ইসলামের (৪৪) জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে খেজুরের রস সংগ্রহ। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। চলতি মৌসুমে ইতিমধ্যে ১৫০টি গাছ প্রস্তুত করেছেন তিনি। প্রতিটি গাছ প্রস্তুত করতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ২৫০ টাকা। নজরুল ইসলাম জানান, আর এক সপ্তাহের মধ্যে গাছগুলো থেকে রস সংগ্রহ শুরু করতে পারবেন বলে আশা করছেন। তবে পুরোদমে রস উৎপাদনের জন্য তাঁকে পৌষ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় জানান, লালপুরের রেললাইনের পাশ, ফসলি জমির আইল, বসতবাড়ির আশপাশ ও পতিত জমিতে ছড়িয়ে রয়েছে খেজুরগাছ। এসব গাছের রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করেন স্থানীয় গাছিরা। সঠিক নিয়মে গাছ প্রস্তুত করা গেলে একটি খেজুরগাছ থেকে পুরো মৌসুমে প্রায় ২৫ কেজি পর্যন্ত গুড় পাওয়া সম্ভব। খেজুরগাছকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ জীবিকা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়াতে গাছিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।

তবে উৎপাদনের সম্ভাবনার পাশাপাশি খেজুরের কাঁচা রসের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাদুড়ের মাধ্যমে কাঁচা খেজুরের রসে নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। তাই রস সংগ্রহের পাত্রের মুখ ঢেকে রাখা এবং বাদুড়ের সংস্পর্শ থেকে রস সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মুনজুর রহমান। তিনি বলেন, কাঁচা রস পান না করে ভালোভাবে ফুটিয়ে বা জ্বাল দিয়ে খাওয়া নিরাপদ।

খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড়ের স্বাদ ও সুনাম ধরে রাখাও এ অঞ্চলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের দাবি, উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ভেজাল প্রতিরোধে প্রশাসনের নজরদারি থাকতে হবে। একই সঙ্গে মানসম্মত গুড় উৎপাদন এবং নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শীতের আগমনে লালপুরের খেজুরগাছগুলো এখন নতুন মৌসুমের অপেক্ষায়। গাছিদের শ্রম, কৃষি বিভাগের সহযোগিতা এবং নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্য শুধু গ্রামবাংলার শীতের স্বাদই ধরে রাখবে না, স্থানীয় অর্থনীতিতেও যোগ করতে পারে উল্লেখযোগ্য মূল্য।

উপসম্পাদক /প্রাপ্তি প্রসঙ্গ/২৩-০১

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.