| |

শিরোনাম

আব্বা চলে যাওয়ার ১৮ বছর

-তারেক চৌধুরী:

‘রাব্বানাগ ফিরলি ওয়ালিওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিলমুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’

অর্থ: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাকে, আমার বাবা-মাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন, যেদিন হিসাব কায়েম হবে।

আসসালামু আলাইকুম।

আব্বা চলে যাওয়ার ১৮ বছর হয়ে গেলো। ২০০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মহা প্রভুর ডাকে আমাদের ছেড়ে চলে যান। পরিচিত মুখটা ক্রমেই অস্পষ্ট হতে চলেছে। মৃত্যুর সংবাদ শুনে লন্ডন থেকে সিলেটে গিয়ে জানাজায় শরীক হই। মাঝে মধ্যে মনে হয় আমাদের দিনও ফুরিয়ে আসছে। মরে গেলে মানুষ কোথায় যায়। নিজের বয়সের দিকে তাকিয়ে ভাবি আমরাও চলে যাব। আমাদের চেয়ে বয়সে ছোট অনেক কম বয়সী মানুষ মারা যায়, সেই হিসেবে আমি ভাগ্যবান। যদিও হৃদয়ের গভীরে সব কিছুই আগের মত স্বচ্ছ। গত বছর আব্বাকে নিয়ে লেখাটা পড়তে গিয়ে ভাবলাম মৃত্যুর দৌড়ে আমরাও হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছি। সুর্যোদয়ের সময় স্টেশনে একজনকে ড্রপ করে ভাবছিলাম এমন একদিন আসবে যেদিন সুন্দর আসমান জমিন থাকবে কিন্তু আমি থাকবো না যেমনটি আমার আব্বা চলে যাওয়ার ১৮ বছর হলো। দুনিয়ার সব কিছু স্বাভাবিক। শুধু কেয়ামতের জন্য অনন্তকাল অপেক্ষা। আজ আব্বার সান্নিধ্যে বেড়ে উঠার দিনগুলো মনে ভাসছে আর জীবন এতো ছোট তার উপলব্ধি মনে ভর করছে। স্কুলে পড়ার সময় আজ থেকে অনেক বছর আগে (৪২/৪৩ বছর হবে হয়তো) আব্বার সঙ্গে হয়তো কোন রমজানে বা অন্য কোনো দিন এমন সময় শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের মসজিদে ফজরের নামাজ পড়তে যেতাম। আব্বা পেছনে হাত দুটো এক সাথে ধরে হয়তো ধীর কদমে হাঁটতে হাঁটতে পড়ছেন ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল, নি’মাল মাওলা ওয়া নি’মান-নাসির’ (অর্থ : আল্লাহ তাআলাই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আল্লাহ তাআলাই হচ্ছে উত্তম অভিভাবক )।’ মসজিদে গিয়ে আমাদের ভাইদের কেউ ইকামত দিতেন, আব্বা ইমামতি করতেন। আব্বা জোরে জোরে দোয়া করতেন ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান্নার। (অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন। )’। আরো কত দোয়া দুরুদ পড়তেন। আব্বার সাথে আমরা দুরুদ পড়তাম। বয়স আর সময়ের কারণে অনেক কিছু আর স্পষ্ট মনে ভাসছে না।

নামাজ শেষে বাসায় ফিরে কিছু সময় কোরআন পড়তেন, পরে স্কুলের কোন কাজ থাকলে তা করতেন। আমরাও কোরআন পড়তাম। শীতের সময় বাগানে আলু পিয়াজে কিংবা টমেটোতে পানি দিতেন। কাজের লোক একই সাথে স্কুলের দপ্তরী সুন্দর আলী ভাই না থাকলে গাই কিরানী বা দুধ দোহানী কাজটাও আব্বা করতেন। তারপর গোসল সেরে স্কুলে যেতেন। স্কুলে যেতে প্রথম কাজটা করতেন স্কুলের এসেম্বলিতে (জাতীয় সংগীতের পর কিংবা পূর্বে) ছাত্রদের উদ্দেশ্যে কথা বলতেন দিক নির্দেশনা দিতেন। বিকেলে স্কুলে আসতো ইত্তেফাক পত্রিকা। স্কুল ছুটির পর আব্বা পত্রিকা পড়তেন। সেই সাথে আমি / আমরা পত্রিকাটা পড়ে নিতাম। সেই থেকে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ফিজিক্সের প্রধান পরীক্ষক ছিলেন বিশ বছরের মত। এসএসসি পরীক্ষা শেষে হলে বোর্ড থেকে স্কুলেই আসতো পরীক্ষার খাতা। মাঝে মধ্যে আব্বা রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত স্কুলেই খাতা দেখতেন। বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন দীর্ঘদিন। এসএসসি পরীক্ষায় টেস্ট গাইড / প্রশ্নপত্র সংকলন ছাপাতেন সমিতির পক্ষ থেকে। বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকরা আসতেন প্রি-টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন কিনে নিতেন। আব্বার আশেপাশে থাকার সুবাদে কত স্কুলের নাম শুনেছি এবং জেনেছি। এখন ঐসব এলাকার নাম শুনলে পরিচিত মনে হয়। আব্বা শিক্ষক নেতা হওয়ায় প্রায়ই মেইল ট্রেনে করে ঢাকা থেকে ভোর রাতে শায়েস্তাগঞ্জ ফিরতেন। আম্মা ভোর রাতে অপেক্ষা করতেন। রিকশায় ফিরতেন শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশন থেকে। হারিকেন ওয়ালা রিকশায় করে। আম্মাসহ আব্বা বা আম্মা আমাদেরকে নিয়ে কোথাও গেলে রিকশায় শাড়ী বা চাদর পেঁচিয়ে পর্দা রক্ষা করা হতো। আমরা সবাই জুম্মাবারে আব্বার সাথে শায়েস্তাগঞ্জ পুরানবাজার মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যেতাম। নামাজ শেষে পুরানবাজারে ব‍ ব্যবসায়ী চান মিয়া সাহেবের কাপড়ের দোকানে কিছু সময় বসতেন। আরো ২/১ টা দোকানে যেতেন এবং দ্রুত বাসায় ফিরতেন। কোন সময়ে সময় হলে আব্বার প্রিয় ছাত্র ওয়াহিদুর রহমানের পেট্রোল পাম্পে যেতেন। সাথে আমরাও যেতাম। তার গাছের শফরী/ পেয়ারা আমাদেরকে দিতেন আসার সময়। তার জীপ ছিল। দেরী হলে আব্বাকে ড্রপ করে যেতেন।

আব্বাকে নিয়ে কত স্মৃতি। আমাদের সাথে আব্বার সম্পর্ক ছিল ফরমাল। আব্বাকে যেমন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা বাঘের মত ভয় করতো। আমরাও সে রকম ভয় করতাম। আমরা কোথাও গেলে মাগরিবের নামাজের আগে বাসায় ফেরা আমাদের জন্য আইন ছিল।১৯৪৮ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত শায়েস্তাঞ্জ স্কুলের শিক্ষক। আব্বার কথাই আইন ছিলো। একজন নীতিবান লোক (Man of principle) ছিলেন । তার এই নীতি আদর্শের জন্য শায়েস্তাগঞ্জ তথা হবিগঞ্জ অঞ্চলে মানুষের মনে এখনো শ্রদ্ধার আসনে আসীন। আমি আব্দুন নুর চৌধুরীর সন্তান হিসেবে নিজেকে এখনো গর্বিত বোধ করি। আল্লাহ তাঁর কবর ও হাশর সহজ করে বেহেশত মঞ্জুর করুন, এই দোয়া করছি। রাব্বীর হামহুমা কামা রাব্বায়ানী সাগিরা (অর্থাৎ, হে আমার প্রতিপালক! আমাদের পিতা-মাতা আমাদেরকে শৈশবে যেভাবে লালন-পালন করেছেন, সেভাবে তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন। )’ আজ আর নয়। ভুল ত্রুটি মার্জনা করবেন। নিজের বড়ত্ব প্রকাশিত হলে ক্ষমাপ্রার্থী। সকলের মঙ্গল কামনা করি ।

*তারেক চৌধুরী: অধ্যক্ষ, কিংডম সলিসিটরস; সম্পাদক, বাংলা পোস্ট; সভাপতি, লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.