| |

শিরোনাম
কামরূপ-কামাখ্যার ভয়ংকর ও রহস্যময়তায় ঘেরা এক মায়াং গ্রাম ৭ই নভেম্বরের ঐতিহাসিক ও বর্তমান প্রেক্ষিত পিএইচপিতে সাইবারঝুঁকি ও বৃটেনে তিনদিনের রসদশঙ্কা প্রসঙ্গ লালপুরে বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধার বাউয়েটে ১৬তম ব্যাচ ও এমএ ইন ইংলিশ শিক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত বড়াইগ্রামে চলনবিল পুনরুদ্ধার ও ভূমি-পানি সম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত রাস্তা-ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কঠোর আল্টিমেটাম ইউএনও-র  মেহমানের ব্যস্ততার ফাঁকে প্রাণ গেল দুই চাচাতো বোনের ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যার বিচার দাবি ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত বিনামূল্যে চিকিৎসায় ‘এলিট থেরাপি কেন্দ্র’ উদ্বোধন

কামরূপ-কামাখ্যার ভয়ংকর ও রহস্যময়তায় ঘেরা এক মায়াং গ্রাম

-আলমগীরুল নিউটন :

লাল রঙের গাড়িতে চড়ে রাহুলের সেনবাড়ির দিকে রওনা হলাম। রাহুলের বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়।

এরপর রাহুল যা বলতে শুরু করলেন, তা লিখে প্রকাশ করা ঠিক হবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলাম। মায়াং গ্রামে গিয়ে যে অদ্ভুত ও রহস্যময় ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেগুলো সত্যিই অবিশ্বাস্য!

রাহুলের এবারের গন্তব্য ভারতের আসাম রাজ্যের মরিগাঁও জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত ভয়ংকর ও রহস্যময়তায় ঘেরা মায়াং গ্রাম। সেখানে দূরবর্তী গভীর অরণ্যের পাহাড়ি গুহায় বাস করেন এক বৃদ্ধ তান্ত্রিক সাধক। ইতিমধ্যে তাঁর সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছেন রাহুল। তাই তাঁকে একনজর দেখার প্রবল আগ্রহ তাঁর মনে জেগে উঠেছে।

রাহুল তাঁর মুসলমান বন্ধু জাহিদ এবং এক স্থানীয় অল্পবয়সি সাধুকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন।

কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর পথিমধ্যে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। সেখানে একটি বড় পাথরের মূর্তি থেকে গায়েবি আওয়াজ ভেসে এল।

আওয়াজটি বলল, — ওর সঙ্গে কে? হিন্দু না মুসলমান? মুসলমান হলে ওকে সঙ্গে এনেছিস কেন?

রাহুল বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিলেন না। তাঁরা আবার চলতে শুরু করলেন।

আরও কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ ধূলিঝড় শুরু হলো। চারদিকে অন্ধকার ছেয়ে গেল। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল যেন রাত নেমে এসেছে। অথচ তখন তো সকালবেলা! এমনটা হওয়ার কথা নয়।

এই অবস্থায় তিনজন রাস্তার পাশের একটি ছোট্ট কুঁড়েঘরে আশ্রয় নিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ঘরটিতে কেউ ছিল না। তাঁরা কিছুটা চিন্তায় পড়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ধূলিঝড় থেমে গেল। চারপাশ আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠল। রাহুলরা ধীরে ধীরে সবকিছু ভুলে গেলেন।

ঠিক যখন তাঁরা আবার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন, তখন হঠাৎ সেখানে এক বিশালদেহী ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটল। প্রায় ২০ ফুট লম্বা, পুরো শরীর সাদা কাপড়ের আলখেল্লায় ঢাকা।

তিনি বললেন, — এই তোরা ওদিকে যাসনে। পথে তোদের বিপদ আছে।

তিনজনই চিন্তায় পড়ে গেলেন। কী করবেন, বুঝতে পারছিলেন না।

তবে তাঁদের প্রত্যেকের মনেই রহস্যের শেষ দেখার প্রবল ইচ্ছা জেগে উঠল। এমনিতেই তাঁরা বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। ভূত-প্রেত কিংবা অদৃশ্য কোনো শক্তিতে তাঁদের বিশ্বাস নেই। তাই শেষ পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিলেন।

যেহেতু তাঁরা ইতিমধ্যে রওনা হয়েছেন এবং সেই রহস্যময় ব্যক্তির বাড়ির প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন, তাই তাঁর কথায় কান দিলে আর যাওয়াই হবে না।

সুতরাং রাহুলরা এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।একটু এগিয়ে একটি দরজা পেরিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখলেন, সেই লোকটি আর সেখানে নেই! তাঁরা আবার চলতে লাগলেন। আরও কিছুটা সামনে এগিয়ে পিছনে ফিরে বাড়িটির দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলেন। বাড়িটিও উধাও!

এবার তাঁদের মনে কিছুটা ভয়ের সঞ্চার হলো।

মায়াংকে ঘিরে প্রচলিত একটি ঐতিহাসিক কিংবদন্তির কথা রাহুলের মনে পড়ে গেল।

কথিত আছে, ১৩৩৭ সালে দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ শাহের পাঠানো এক বিশাল সৈন্যবাহিনী আসাম অভিযানে এসে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে গিয়েছিল। জনশ্রুতি রয়েছে, মায়াংয়ের জাদুবিদ্যার প্রভাবে সৈন্যরা আর ফিরে যেতে পারেনি।

তবে এই ঘটনার বিবরণকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এটি মায়াংকে ঘিরে প্রচলিত রহস্যকাহিনিরই একটি অংশ।

ধূলিঝড়ের কারণে ধুলোয় হাত-মুখ ময়লা হয়ে গিয়েছিল। সেগুলো ধোয়ারও প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া তাঁরা বেশ পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই রাস্তার পাশের একটি পুকুরে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য গেলেন।

পুকুরটিকে ঠিক সাধারণ কোনো পুকুর বলে মনে হলো না। পানির স্রোতগুলো একবার এপার থেকে ওপারে যাচ্ছে, আবার ওপার থেকে এপারে ফিরে আসছে।

হঠাৎ একটি বড় মাছ লাফ দিয়ে উঠল। মাছটির রং কেমন যেন সোনালি!

সবাই একটু আশ্চর্য হলেন। মাছের রং আবার সোনালি হয় নাকি?

তবে রাহুলের মনে পড়ে গেল, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের চৌবাচ্চায় তিনি এ ধরনের ছোট ছোট লাল রঙের মাছ দেখেছেন। সেগুলো নিয়েও একটি গল্প আছে। সেটি পরে একদিন বলবেন।

পাশের জঙ্গলের দিকে চোখ পড়তেই দেখা গেল, একজন বৃদ্ধা সেখানে বসে মাছ ধরছেন। তাঁর বড়শি পানিতে ফেলা আছে, কিন্তু ঝুড়িতে কোনো মাছ দেখা যাচ্ছে না। তিনি একমনে পুকুরের দিকে তাকিয়ে আছেন।

আমরা নিজেদের উপস্থিতি জানানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তাঁকে দেখে মনে হলো, তিনি আমাদের দেখতে পাননি।

আমরা হাত-মুখ ধুয়ে নিলাম। ঠিক যখন উঠে আসব, তখনই দেখলাম, পাশের একটি লম্বা গাছ থেকে একটি পাতা খসে পানিতে পড়ল। আশ্চর্যের বিষয়, পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাতাটি মাছে পরিণত হলো! মাছটি সঙ্গে সঙ্গে সেই বৃদ্ধার দিকে এগিয়ে গেল। বৃদ্ধাও ছোট্ট হাতজাল দিয়ে মাছটি তুলে ঝুড়িতে রাখলেন।

ছোট সাধুটি বলল, — এটি মাছগাছ।

মনে মনে বললাম, দূর বোকা! মাছের আবার গাছ হয় নাকি?

সে নাকি শাস্ত্রে পড়েছে, সাধুরা নির্দিষ্ট কিছু গাছের পাতাকে মাছে রূপান্তরিত করতে পারেন।

গাছটি দেখতে অনেকটা ইউক্যালিপটাস গাছের মতো। বেশ লম্বা, ডালপালা কম এবং পাতাও খুব বেশি নয়। ডালপালাগুলো বেশ উঁচুতে।

তর্কে না জড়িয়ে আমরা আবার এগিয়ে চললাম।

রাহুল তিন দিন আগে কামাখ্যা মন্দিরে মায়াংয়ের প্রাচীন হাতে লেখা পুঁথি ও মন্ত্রসংবলিত পাণ্ডুলিপি পড়ার চেষ্টা করেছিলেন। সেখানে নাকি তন্ত্রসাধনা, গাছগাছড়ার চিকিৎসা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিবরণ লেখা আছে। কিন্তু পুঁথির ভাষা ও লিপি এতটাই দুর্বোধ্য যে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না।

বর্তমান এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সেগুলো পড়ার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি একটি লেখার ছবি মোবাইলে তুলে তাঁর এক বন্ধুকে পাঠিয়েছিলেন। সেই বন্ধু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি নিয়ে গবেষণা করেন এবং বিভিন্ন পুরোনো লিপি পড়তে পারেন।

কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তিনিও এর কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি।

এমন রহস্যঘেরা পাণ্ডুলিপি নিয়ে কিছুটা নাড়াচাড়া করার পর উপায়ান্তর না দেখে রাহুল সেগুলো রেখে দিয়েছিলেন। যাই হোক, সে কথা থাক।

শোনা যায়, বিশেষ কিছু তান্ত্রিক সাধকই কেবল এসব পুঁথি পড়তে পারেন।

আরও একটু এগোতেই সেই তান্ত্রিক সাধকের বাড়ি চোখে পড়ল।

দেখা গেল, গেরুয়া পোশাক পরা একজন ব্যক্তি এদিকে এগিয়ে আসছেন। আশ্চর্যের বিষয়, এই ব্যক্তিকেই রাহুল সকালে এক জায়গায় বসে লাবড়া দিয়ে রুটি খেতে দেখেছিলেন। তাঁর সঙ্গে দু-চারটি কথাও হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, দার্জিলিং থেকে এসেছেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি এত তাড়াতাড়ি এখানে এলেন কীভাবে? সকালে তো তাঁকে অন্য জায়গায় দেখেছিলেন!

তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি একেবারেই চুপ। মনে হলো, তিনি বোবা; কথা বলতে জানেন না। একমনে সোজা হেঁটে চলে গেলেন।

রাহুল লোকমুখে শুনেছিলেন, যে পাহাড়ের পাশে এই সাধু বাস করেন, সেই পাহাড়ের পাশ দিয়ে সরকার একটি রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল। রাস্তা তৈরি হলে পাশের একটি শহরের সঙ্গে সরাসরি ও সহজ যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হতো। ফলে সাধারণ মানুষ খুব সহজেই যাতায়াত করতে পারত।

সরকার এ জন্য অর্থ বরাদ্দও দিয়েছিল। কিন্তু বিধিবাম!

রাস্তা তৈরির জন্য সব ধরনের চেষ্টাই করা হয়েছিল। শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা এসে প্রাথমিক কাজ শুরু করেন। রাস্তার লে-আউট দেওয়া হয় এবং মাটি কেটে সমতল করার কাজ শুরু হয়।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একদিন মাটি কেটে রাস্তা সমতল করা হলেও পরদিন দেখা যেত, আগের মতোই উঁচুনিচু হয়ে গেছে। যন্ত্রপাতিও ঠিকমতো কাজ করত না।

এর মধ্যে এক শ্রমিক রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে গেলেন। কয়েকজন আহত হলেন। শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল।

একদিন হঠাৎ একটি পাথর পড়ে একজন প্রকৌশলীর পা গুরুতরভাবে আহত হলো। তিনি আর ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারছিলেন না। অসুস্থ হয়ে তাঁকে হাসপাতালে যেতে হলো।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই পাহাড়ের আশপাশে জিনদের বসবাস। সেখানে তাদের আবাসস্থল রয়েছে। এসব অস্বাভাবিক ঘটনার কারণে শেষ পর্যন্ত সরকার বাধ্য হয়ে রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করে দেয়।

অবশেষে রাহুলরা বৃদ্ধ তান্ত্রিক সাধকের বাড়ির আঙিনায় পৌঁছে গেলেন। নিজেদের উপস্থিতির কথা জানিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

একজন সাগরেদ এসে জানালেন, — বাবা এখন ধ্যানে মগ্ন আছেন। একটু অপেক্ষা করুন।

এই অপেক্ষা যেন আর শেষ হতে চায় না! দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। রাহুলরা অধৈর্য হয়ে পড়লেন। অপেক্ষার প্রহর যে কতটা কষ্টকর, সেদিন তাঁরা তা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন।

এর মধ্যে রাহুলদের দুপুরের খাবার দেওয়া হলো।

বিকেলের একটু আগে অবশেষে তিনি এলেন।

শান্ত চেহারা। মাথা ন্যাড়া। শরীরে সেলাইবিহীন দু-খণ্ড কাপড় জড়ানো।

তিনি রাহুলকে দেখেই বললেন,

— এই রাহুল, তোদের চলে যেতে বলেছিলাম। তোরা গেলি না কেন? আমি তো জানি, তুই খুব ভালো মানুষ। সবাইকে সাহায্য করিস। গরিবদের দান-খয়রাত করিস। কিছুদিন আগে হাসপাতালে পরাগকে তুই রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছিলি। সে খবরও আমার জানা আছে। কিন্তু তোর বন্ধু কি হিন্দু? বল, তাড়াতাড়ি বল! আমার সময় নষ্ট করিস না।

রাহুল সম্পর্কে তিনি যা যা বললেন, সবই মিলে যাচ্ছে! তিনি এসব কথা কীভাবে জানলেন? কে তাঁকে এসব তথ্য দিল?

আমি তাঁর কথা শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত সত্যিটাই বলে দিলাম।

— না, বাবা। আমার বন্ধু মুসলমান।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, — কেন এসেছিস বল?

আমি বললাম, — বাবা, আমার হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা। হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। যদি এই ব্যথাটা দূর করে দিতেন!

তিনি বললেন, — ভগবান ভালো করে দেবেন। তোরা এখনই চলে যা।

এ কথা বলেই তিনি আমার বন্ধুর দিকে একনজর তাকালেন।

রাহুলের সারা শরীর কাঁপতে লাগল। প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভব করল। এরপর সাধক উঠে ভেতরে চলে গেলেন।

তাঁর চলে যাওয়ার দিকে রাহুল অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

এরপর রাহুল যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করল, তার বন্ধুটিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না!

কী ব্যাপার? কিছুই বুঝতে পারল না।

অল্পবয়সি সাধুটিও সেখানে থেকে গেল। তাকে আর সঙ্গে আনতে পারলাম না।

বন্ধুর নাম ধরে ডাকলাম। কিন্তু কোনো সাড়া নেই।

কী মুশকিল! এখন কী করব?

অগত্যা মন্দির থেকে বেরিয়ে রওনা দিলাম।

হঠাৎ দেখলাম, একটি ছাগল আমার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে। ছাগলটির চোখের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। চোখ দুটি যেন আমার সেই বন্ধুর চোখের মতো!

ছাগলটিকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই গেল না। সেও আমার সঙ্গে সঙ্গে চলতে লাগল।

সেই পুকুর পেরিয়ে আমরা আশ্রয় নেওয়া কুঁড়েঘরটির পথ ধরে এগিয়ে চললাম। ছাগলটিও আমার পিছু পিছু আসছে।

আমার আর কিছুই ভালো লাগছিল না।

এরই মধ্যে খেয়াল করলাম, আমার পায়ের যে সমস্যাটি ছিল, সেটি যেন অনেকটাই ভালো হয়ে গেছে। হাঁটতে বেশ আরাম পাচ্ছিলাম। কিন্তু মনটা ভীষণ খারাপ ছিল।

সেই বড় পাথরের মূর্তিটির কাছে এসে পৌঁছালাম। যেখান থেকে প্রথমে আওয়াজ এসেছিল—যেতে নিষেধ করেছিল, বিপদের কথা বলেছিল।

সেই জায়গাটি পার হতেই মাটিতে বসে পড়লাম। ভগবানের কাছে আকুল প্রার্থনা করতে লাগলাম,

— হে ভগবান, তুমি আমার বন্ধুটিকে ফিরিয়ে দাও!

সবাই তো জানে, রাহুল তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। এখন রাহুল কী জবাব দেবে? বন্ধুকে ছাড়া সে বাড়ি ফিরবে কীভাবে?

রাহুলের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। চারপাশের কোনো দিকে তার খেয়াল নেই। শুধু বন্ধুটিকে ফিরে পাওয়ার আকুল বাসনা।

ইতিমধ্যে রাহুল একটি মানত করে ফেলেছে। সে মনে মনে বলল,

— এই কামাখ্যা মন্দিরে সাধুদের খাওয়ানোর জন্য আমি একটি পাঁঠা দেব।

প্রার্থনা শেষ করে যেই ফিরে তাকিয়েছে, অমনি দেখল, ছাগলটি আর সেখানে নেই!

কিছুটা সামনে তাকাতেই দূরে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। আরে, এ তো তার সেই বন্ধু! বন্ধুটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে।

রাহুল অবাক হয়ে গেল।

এ কী!

বন্ধুকে দেখেই রাহুল ভীষণ খুশি হয়ে উঠল। দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।

বন্ধু তো অবাক!

সে বলল, — একটু আগেই তুই আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছিলি। সেই সঙ্গে থাপ্পড়ও মেরেছিস। আর এখন আবার এভাবে জড়িয়ে ধরছিস! ব্যাপারটা কী বল তো?

আমি তাকে আর কিছু বললাম না। শুধু মনে মনে বললাম, ভগবানই বাঁচিয়েছেন!

এবার মনে মনে একটাই প্রার্থনা করলাম, ভালোয় ভালোয় যেন আমরা আমাদের আবাসস্থলে পৌঁছাতে পারি।

আমি বন্ধুকে বললাম, — আগামীকাল কলকাতা চলে যাব।

সে অবাক হয়ে বলল, — সে কী! তুমি তো কয়েক দিন এখানে থাকতে চেয়েছিলে!

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.