
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি ও পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি নদী। শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট, বর্ষায় বন্যা, নদীভাঙন এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত পানিপ্রবাহ তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবনে যে সংকট তৈরি করেছে, তা নিরসনে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। কিন্তু সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পকে ঘিরে যদি ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও প্রতিযোগিতার প্রভাব বাড়তে থাকে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য তা নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
চীনের অবকাঠামো ও কারিগরি সহযোগিতার আগ্রহ, ভারতের আন্তঃসীমান্ত নদী ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংবেদনশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল যেন এই বৃহত্তর বাস্তবতার মধ্যে তিস্তা যেন কোনোভাবেই বৃহৎ শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে।
কারণ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা প্রকল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা এবং অতিরিক্ত কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে তিস্তাপাড়ের সাধারণ মানুষকে।
বাংলাদেশের প্রয়োজন কোনো শক্তির পক্ষ না নিয়ে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ও প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। তিস্তা প্রকল্পের সিদ্ধান্ত হতে হবে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, পরিবেশগত ভারসাম্য, পানি নিরাপত্তা ও মানুষের জীবন-জীবিকার ভিত্তিতে। তিস্তা কোনো ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি নয়। এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনরেখা। তাই তিস্তা প্রকল্পকে ভারত-চীন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকাকে কেন্দ্র করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
গত বছর ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ আন্দোলনের রেশ ধরে জাতীয় নির্বাচনের পর ২০২৬ সালে বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। একই সময়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের তিস্তা-সম্পৃক্ততা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবয় মার্কিন আগ্রহ পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে তিস্তা এখন কেবল পানি, নদী ও কৃষির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের হিসাব-নিকাশ।
এখন বাংলাদেশের জন্য এই ত্রিভূজ প্রতিযোগিতা যদি প্রকল্প বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করার বদলে সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দীর্ঘায়িত করে, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে তিস্তাপাড়ের মানুষই। আর তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণের মূল্য দিচ্ছে উত্তরাঞ্চল।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে সমীক্ষা, পরিকল্পনা, অর্থায়ন, কারিগরি সহযোগিতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না’-এর মধ্যে সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং ধারণাপত্র ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তখনও প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে সময় প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছিল।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছিল। সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, যথাযথ যাচাই-বাছাই শেষে কাজ শুরু হবে। জুনে জাতীয় সংসদে জানানো হয়, তিস্তা ব্যারাজসহ প্রকল্পের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন চলছে এবং সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ১১০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ১১০ কিলোমিটার নদী প্রশিক্ষণ ও ড্রেজিং এবং ২২৪ কিলোমিটার সড়কসহ বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর কথা রয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনার পরিধি ছোট নয়। কিন্তু উত্তরাঞ্চলের মানুষের সাথে দেশের মানুসও বলছে, আর কত পরিকল্পনা, আর কত সমীক্ষা?
তিস্তায় নদীভাঙনে প্রতি বছর মানুষের বসতভিটা ও কৃষিজমি বিলীন হয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা কৃষিকে অনিশ্চিত করে তোলে। কোথাও বন্যা, কোথাও খরা, একই নদী যেন দুই বিপরীত দুর্যোগের বাহক। এই পরিস্থিতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি বছরই মানুষের জন্য হারানো সুযোগের বছর।
এছাড়া ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা খাতিরে সম্প্রতি চীন-মার্কিন উভয় পরাশক্তিই তিস্তা প্রকল্পে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জুনে চীনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়, এ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্পকে শুধু তার অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত মূল্য দিয়ে সবসময় দেখা হয় না। বিশেষ করে কোনো প্রকল্প যদি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ও নদী অববাহিকার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তখন তার কৌশলগত তাৎপর্যও সামনে আসে।
অপরদিকে তিস্তার অবস্থান ভারতের উত্তরবঙ্গের কাছাকাছি এবং শিলিগুড়ি করিডরের ভূকৌশলগত গুরুত্বের কারণে প্রকল্পটির প্রতি ভারতের সংবেদনশীলতা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের বিভিন্ন অগ্রগতির পাশাপাশি তিস্তা প্রকল্পের দিকেও নজর রাখার কথা জানিয়েছে। এখানে বাংলাদেশের কূটনীতির পরীক্ষা হলো, কীভাবে চীনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সহযোগিতা বজায় রেখেও ভারতকে অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা-উদ্বেগে না ফেলা যায়।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, যে কোনো পক্ষ প্রকল্পটির সঙ্গে অন্য পক্ষের সম্পৃক্ততাকে কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে উঠবে। কোনো পক্ষের অর্থায়ন, প্রযুক্তি বা নির্মাণ-অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর যদি নতুন করে ভূরাজনৈতিক আপত্তি দেখা দেয়, তাহলে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, অর্থায়ন কাঠামো, দরপত্র ও নির্মাণ, প্রতিটি পর্যায়েই বিলম্ব হতে পারে। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে, নকশা পরিবর্তিত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এর আগেও তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ সময় অগ্রগতি না হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকল্পটির অগ্রগতি নিয়ে হতাশার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
কিন্তু বাংলাদেশের তিস্তা নদী কোনো ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি নয়। চীন যদি অর্থ, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সহযোগিতা করতে চায়, বাংলাদেশ তা জাতীয় স্বার্থে বিবেচনা করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি পানি ব্যবস্থাপনা, নদী অববাহিকা, তথ্য বিনিময় ও আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করতে চায়, সেটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো দেশ প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিতে চাইলে তাদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত হতে পারে; কিন্তু সিদ্ধান্তের চাবি বাংলাদেশের হাতেই থাকতে হবে।
এ ক্ষেত্রে একটি বহুপক্ষীয় ও বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের নিজ নিজ স্বার্থ থাকলেও প্রকল্পের মূল সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত বাংলাদেশের পরিবেশগত প্রয়োজন, নদীর প্রাকৃতিক গতিপ্রকৃতি, কৃষি, পানিসম্পদ, বন্যা ব্যবস্থাপনা ও মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর ভিত্তি করে।
কিন্তু এ নিয়ে বার বার সময়ক্ষেপণ করায় উত্তরাঞ্চলে দারিদ্র বাড়ার ঝুঁকি তৈরী করছে। তিস্তা সংকটকে শুধু নদীভাঙন বা পানি সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর সামাজিক অভিঘাত বোঝা যাবে না।
নদীর অনিশ্চয়তা কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আয় কমে; আয় কমলে ঋণ বাড়ে; কর্মসংস্থানের জন্য মানুষ শহরে চলে যায়; পরিবারের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় সংকুচিত হয়।
এভাবে নদী সমস্যা ধীরে ধীরে দারিদ্র্য, অভিবাসন ও সামাজিক বৈষম্যের সমস্যায় রূপ নেয়।
তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন স্বচ্ছ ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। তিস্তা প্রকল্প নিয়ে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের দক্ষতা। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব, অর্থায়নের ধরন, ঋণের শর্ত, প্রকল্প ব্যয়, নির্মাণকাল, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং সম্ভাব্য সামাজিক পুনর্বাসন, সবকিছু মিলে এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেবার দিকে। ২০২৬ সালে যখন প্রকল্প নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তখন বাংলাদেশকে একই সঙ্গে দুটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, প্রকল্পের কারিগরি ও পরিবেশগত যাচাই দ্রুত শেষ করা; দ্বিতীয়ত, প্রকল্পকে মার্কিন-ভারত-চীন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা।
সাম্প্রতিক আলোচনায় বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ অবকাঠামো, পানি, প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক সংযোগের মতো বিষয়ে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার বদলে নিজস্ব স্বার্থকে কেন্দ্র করা। তিস্তার ক্ষেত্রেও এই নীতিই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
তিস্তা নিয়ে বাংলাদেশের আর সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই। নদীভাঙন, শুষ্ক মৌসুমের পানিসংকট, বর্ষার বন্যা, কৃষির ক্ষতি ও ক্রমবর্ধমান জীবিকা সংকট তিস্তাপাড়ের মানুষের জন্য প্রতিদিনের বাস্তবতা। অথচ এই জীবন-মরণ প্রশ্নটি যদি ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রভাববলয়ে চলে যায়, তাহলে একটি প্রয়োজনীয় উন্নয়ন প্রকল্পও দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার শিকার হতে পারে। কে কার প্রভাব বাড়াচ্ছে, এই হিসাব করতে গিয়ে যেন বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ আড়ালে না পড়ে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্র ভেদে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র তিন দেশের সহযোগিতা নিয়ে বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ নীতিতে অবস্থান নিয়ে কাজ শুরু করতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতাও নিতে পারে। কিন্তু তিস্তা প্রকল্পের সিদ্ধান্ত কোনো একক শক্তির ভূরাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিফলন হওয়া উচিত নয়, এমন নতুন চুক্তি করে কাজ শুরু করা উচিত। প্রকল্পের নকশা, অর্থায়ন, পরিবেশগত প্রভাব, পানি ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে।
তিস্তা কোনো পরাশক্তির প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হতে পারে না। এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনরেখা। তাই তিস্তা প্রকল্পে ত্রিভূজ দ্বন্দ্বের প্রভাব পর্যালোচনা করে আমরা চাই দ্রুত, স্বচ্ছ, টেকসই ও জনগণকেন্দ্রিক আবহে একটি নতুন তিস্তা প্রকল্পের বাস্তবায়ন।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]