
প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
এবছর জাতীয় নির্বাচন, রমজানের রোজা এবং আরো নানা কারণে একুশের বইমেলা দেরীতে শুরু হয়েছে। নির্বাচিত নতুন সরকার এবছর মেলায় বুকস্টল বরাদ্দের জন্য ফি মওকুফ করে দিয়েছেন। রোজার মধ্যে শুরু হওয়া বইমেলায় দিনের বেলা ক্রেতা-দর্শক সমাগম অনেকটা কম হলেও ইফতারের পর ব্যাপক জনসমাগম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বইপ্রেমিকদের সাথে কচিকাঁচাদের উপস্থিতিও বেশ লক্ষ্যণীয়। শিশুরা ছাপানো বইয়ের তুলনায় কৃত্রিম শব্দসম্বলিত ই-বুক বেশী পছন্দ করে।
এবছর ২৬ শে ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হওয়া বইমেলা ১৫মার্চ পর্যন্ত চলবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে ঈদুল ফেতের পর্যন্ত চলতেও পারে। বর্তমান এআই যুগের পড়া-লেখার আদলে নতুন আঙ্গিকে শুরু হওয়া বইমেলা আমাদেরকে কিধরণের বইপুস্তক উপহার দিচ্ছে তা অনেকের কাছে বিরাট কৌতুহলের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরেও বাংলাভাষাভাষীদেও নিকট প্রাণের আবেগ মেশানো চিরন্তন চিন্তাভাবনার একুশে বইমেলা বলে কথা!
আমাদের দেশে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারী মাস এলেই বাংলাভাষার ওপর নানা চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে যায়। বিভিন্ন সেমিনার, বইমেলা, আলোচনা সভায় বাংলাভাষার ভাল-মন্দের ওপর ব্যবচ্ছেদ চলে। অনেকের মনে একুশের প্রতি দরদের মাত্রা যেন উথলে উঠে। তাঁরা বাংলা ভাষার ওপর নানা পরামর্শ ও প্রতিশ্রুতি দেন। কেউ কেউ সেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি তাগিদও দেন। তবে ফেব্রুয়ারী মাসটি শেষ হলেই যেন সবাই সবকিছু বেমালুম ভুলে যেতে বসেন। এভাবে প্রতিবছর একুশের প্রতি দরদ-তাগিদ শুধু একমাসে মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। এ অবস্থাদৃষ্টে অনেকে এটাকে বাংলাভাষার প্রতি প্রতারণা ও অমর্যাদাকর বিষয় বলে মনে করেন।
কারণ, আমরা অনেকে দায়িত্বশীল পদে থেকে নানা প্রতিশ্রুতির কথা জনসম্মুখে বলে ফেললেও কার্যত: সেগুলো বাস্তবায়ন করতে অনীহা ও অপারগতা দেখাই। ফলে ইতিবাচক কোন নীতিমালা অদ্যাবধি গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এর প্রভাব আমাদের প্রিয় মাতৃভাষাকে ব্যবহারিক দিক দিয়ে ভীষণ নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। আমরা এর প্রতিকার করার উপায় খুঁজে পাচ্ছি না বরং উল্টো এই নাজুক অবস্থাকে লাইসেন্স ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে লালন করছি।
সেদিন পার্কে এক বিদেশিনীকে চমৎকারভাবে বাংলাভাষায় কথা বলতে দেখে কিছুটা আবেগাপ্লুত স্বরে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- তাঁর দেশ কোথায়? কীভাবে বাংলাভাষা শিখলেন? তিনি জানালেন, ‘আমেরিকা। পরিবারের কাছে বাংলা শিখেছি।’
বাংলাভাষার ভবিষ্যৎ কেমন? জানতে চাইলে তিনি উত্তরে যা বললেন তা শুনে আমি কিছুটা বিব্রত হলাম। তিনি শোনলেন- আপনারা কথা বলার সময় ইংরেজী-বাংলা মিশিয়ে কথা বলেন। তাতে বিদেশীদের সহজে বোঝার উপায় নেই যে আপনি আসলে কোন ভাষায় কথা বলছেন।
ধরুন আপনি একটি সেমিনারে বক্তার উত্তরে বললেন-‘আপনার কমেন্টস্ গুলোক স্ট্রংলি সাপোর্ট করছি।’ এই বাক্যে তিনটি বাংলা ও তিনটি ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করলেন। এতে বোঝা গেল না -এটা আসলে কোন ভাষা ! এভাবে এফ.এম রেডিও, টিভি- সবখানেই মিশ্রভাষা ব্যবহার করা হয়। যেটা বাংলাভাষার নিজস্ব ব্যবহার বিধি ও মর্যাদাকে নষ্ট করছে। বিদেশিনীকে যুক্তি দিয়ে আমাদের ভাষার দুর্বল ব্যবহারবিধি চিহ্নিত করতে দেখে লজ্জায় আমার মাথা হেট হয়ে গেল। বাংলাভাষায় এভাবে মিশ্রণ করতে গিয়ে ইংরেজি শব্দগুলোকেও আমরা বিকৃতভাবে উচ্চারণ করে থাকি। সেটাও বিদেশীদের জন্য বোঝা মুষ্কিল হয়ে দাঁড়ায়।
অবাধ ইন্টারনেটের যুগে ভিনদেশী কৃষ্টি-সংস্কৃতির আগ্রাসন আমাদেরকে বাংলাভাষার নিজস্ব ব্যবহার বিধি ও স্বকীয়তা থেকে অনেক দুরে ঠেলে দিয়েছে। বাচ্চারা হিন্দি কার্টুন দেখে হিন্দিতে কথা বলছে।
সেদিন এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে বিদেশীদের উপস্থিতিতে একজন বলতে লাগলেন- এটা ভাষার মাস তাই বাংলায় কথা বলতে হচ্ছে। বিদেশীদের উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে এগুলো বলাটা আমার কাছে মনে হলো ন্যাকামী। এখানে তিনি তাঁর দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। ফেফ্রুয়ারী মাস বলে এভাবে বাংলাভাষাকে মর্যাাদা দেয়াটা ভাল দেখায় না। একজন তো মন্তব্য করেই বসলেন- ‘বাকী ১১ মাস কোন
তাগিদ নেই আর একমাসের জন্য দরদ উথ্লে উঠলো?’
একুশের সেমিনারে বাঙলাভাষার প্রতি দরদ দেখাই, ইংরেজির তুলোধুনো করি, আর সেমিনার শেষে বাসায় ফিরেই ড্যাডি, মাম্মি, গুড মর্নিং বলার চর্চা করি। এই আমাদের মাতৃভাষার প্রতি দরদের নমুনা।
এদিকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করার জন্য বায়না ধরি। অপরকে পরামর্শ দিই। এটাও মাতৃভাষার প্রতি কপটতা করার শামিল। এখন পঞ্চম শিল্পবিপ্লব এনে দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং মেধা। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ইংরেজি ও অঙ্ককে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে গেলেও ডিজিটাল মানদন্ডে মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষাকে এখনও বেশী দূর এগিয়ে নিতে পারিনি। এই আই সঞ্জাত বাংলালেখা এখনও সঠিক ভাব নিয়ে পড়া যায় না। সেটাতে মনের কথা কথা ফুটে উঠে না। এআ্ই দিয়ে লেখা কাঠখোট্টা টাইপের ভাবহীন সাহিত্য আমাদের বাংভাষাকে অনেকটা অসাড় ও কৌতুকের বিষয়ে পরিণত করে তুলছে। যার সাথে রক্তমাংসের মানুষের মুখের কথার সাবলীলতা নেই, নেই কোন প্রাণ। তাই সেসব আজগুবি শব্দ দিয়ে লেখা বই মানুষ এক নজর দেখার পর মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তাই এখন আর বাংলায় কেউ ই-মেইল করতে আগ্রহ দেখায় না। মোবাইল ফোনের মেসেজটাও বাংলা হরফে না লিখে ইংরেজি হরফে লিখে থাকে।
এছাড়া বাংলাভাষায় প্লেজারিজম পরীক্ষা করার মত এন্টি-প্লেজারিজম সফট্ওয়্যার এখনও তৈরী হয়নি বিধায় বাংলা পান্ডুলিাপি ও বাংলায়কৃত গবেষণা রিপোর্টের ওপর একাডেমিক নকল ও চৌর্যবৃত্তি ধরার বা পরীক্ষা করার ক্ষেত্র তৈরী হয়নি। যুগের প্রয়োজনে এটা তৈরীতে মনোনিবেশ করা জরুরী। বাংলা একাডেমির অধীনে সেই ১৯৫৫ সালে অনুবাদ শাখা খোলা হলেও এখনও বলা হয় বরাদ্দ কম।
আমরা জানি অনুবাদ হলো একটি দেশের গোপন দূত। অনূদিত বই-পুস্তকের মাধ্যমে আমরা বিদেশকে জানতে পারি, বিদেশ আমাদেরকে চিনতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অনূদিত বই দিয়ে নোবেল পুরস্কার মনোনয়ন দেয়া হয়ে থাকে। অথচ এখনও আমারা নিজেদের মধ্যে ইংরেজি প্রীতি পুষে চলি। আমরা এটাও জানি যে, যিনি তাঁর মাতৃভাষায় ভাল দখল রাখেন তিনি সহজেই যে কোন বিদেশী ভাষাকেও আয়ত্বে নিতে পারঙ্গম।
তাই এখন সময়ের দাবী- বাংলাভাষার বিৃকত উচ্চারণ বন্ধ করুন। এফএম রেডিও-র নামে বিৃকত বাংলা উচ্চারণ বলে আমাদের মাতৃভাষাকে আর অমর্যাদা করবেন না। টিভি, কনসার্ট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুদ্ধ ও নির্ভুল বাংলা ব্যবহার করুন। মিশ্র বাংলা পরিহার করুন। তা না হলে বিদেশীরা আমাদের বিকৃত কথা শুনে উপহাস করতেই থাকবে।
বৃটেনে দ্বিতীয় সর্বচ্চো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী এখন বাংলাভাষী। জাতিসংঘ বাংলাভাষাকে অনেক আগেই মর্যাদার আসনে বসিয়ে আমাদের মাতৃভাষাকে বিশ্ব দরবারে বিশেষ আলোয় অলংকৃত করেছে। এখনও আমাদের দেশে বাংলায় অনুদিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাঠ্যবই নেই। আমাদের শিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন সবকিছুর বৈশ্বিক পরিচিতি ও স্বীকৃতি আদায়ে বিদেশী ভাষার বই-জার্নাল বাংলাভাষায় বেশী
বেশী অনুবাদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেয়া জরুরী।
পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের আবহে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং মেধার জয়জয়কার শোনা গেলেও এতে আসল বাংলাভাষার বড় বিপদ ঘটেছে বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ বাংলায় আসল-নকল প্রাণহীন লেখা শণাক্ত করা বা ধরার জন্য উপযুক্ত গবেষণা হচ্ছে না। বাংলায় এ্যন্টি প্লেজারিজম সফটওয়্যার তৈরীর কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কারণ, কম্পিউটারের হতে এখন কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরীর ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। সেখানে মন-প্রাণের আবেগ বাতুলতা মাত্র। মানুষের মনের ভাষার মাধুর্য্য মেশিনের নির্দিষ্ট গন্ডি বা ডোমেইন দিয়ে সাজিয়ে রাখলে এর সমাধান পাবার চিন্তা করাটা অমূলক।
সেজন্য হয়তো বইয়ের প্রতি মানুষের দরদ শুধু একমাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আরো অনেক কমে যেতে পারে। নতুন প্রজন্মের কারো কারো কাছে এটা হাস্যকর মনে হলেও হয়তো সামনের দিনগুলোতে সেটাই ঘটতে চলেছে। তাই শুধু মেশিনকে জিজ্ঞাসা না করে নিজের মেধা ও মনকে বার বার জিজ্ঞাসা করে মানব মগজে-কলমে জ্ঞানের বিস্তারে মনোযোগী হওয়া দরকার। কারণ মেশিনের কাছে মায়ের ভাষার মাধুর্য্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
আমাদেরকে মায়ের ভাষায় টিকে থাকতে হলে কিছুটা সময় বরাদ্দ করে নিজস্ব মেধা বা মগজের বুৎপত্তি আরো শাণিত করতে হবে। হয়তো তখন মন চাইবে আরো মেধাবী হই, প্রতিদিন বই পড়ি।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও
সাবেক চেয়ারম্যান। E-mail: [email protected]