
নিজস্ব প্রতিবেদক :
একসঙ্গে তিন লাশের খাটিয়া। শোকাচ্ছন্ন লালপুরের নগরকয়া। মায়ের আহাজারী, ‘ও বেটা, একবার ডাকো বেটা। ওরে আমার মানিক বেটা, ওরে আমার কাইলি বেটা, আমাকে দেখপি ( (দেখবে) কে রে বেটা!’
নাটোরের লালপুরে মঙ্গলবার (২৪ মার্চ ২০২৬) সকাল পৌনে ৭টার দিকে ঈশ্বরদী-লালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের উপজেলার ঈশ্বরদী ইউনিয়নের নবীনগর গ্রামে বালুবাহী ট্রাকের চাপায় নিহত হন, উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের ভেল্লাবাড়িয়া (নগরকয়া) গ্রামের মৃত জোয়াকুল ইসলাম ওরফে জোহা মাস্টারের ছেলে জাহিদুল ইসলাম (৫০), সেকেন্দার আলীর ছেলে মনির হোসেন (২৭) এবং ফজলুর রহমানের ছেলে বাবুল আলী (৪০)। আহত হন, একই গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে রাজিবুল ইসলাম (২৬), সিদ্দিক আলীর ছেলে রাব্বি (২৫), আব্দুল খালেকের ছেলে মজনু (৩৫) এবং আজিতের ছেলে মিঠুন (৩০)।
ট্রাকচাপায় প্রাণ হারানো তিন দিনমজুরের মৃত্যু শুধু তিনটি প্রাণহানিই নয়, প্রতিটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ। পরিবারগুলোর ঘরে উপার্জনের আলো নিভে যাওয়ার করুণ গল্প। উপজেলার দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের ভেল্লাবাড়িয়া (নগরকয়া) গ্রামে বইছে শোকের ভারী বাতাস। চারদিকে শুধু কান্না আর আহাজারি।
গ্রামে প্রবেশ করতেই কানে আসে সন্তানহারা মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ। পাশাপাশি তিনটি বাড়িতে তিনটি লাশ। কোথাও মায়ের হাহাকার, কোথাও স্ত্রীর নিস্তব্ধতা, কোথাও সন্তানের নির্বাক চাহনি। যেন পুরো গ্রামটাই এক বিশাল শোকপুরিতে পরিণত হয়েছে।
নিহত বাবুল আলীর মা ছেলের লাশের পাশে বসে বিলাপ করছেন, ‘ওরে আমার মানিক বেটা, ওরে আমার কাইলি বেটা, আমাকে দেখবি কে রে বেটা!’ তার সেই কান্না শুনে আশপাশের মানুষের চোখেও নেমে আসে অশ্রু।
বাবুলের স্ত্রী রাখি শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, সংসারের অভাব মেটাতে তার স্বামী প্রায়ই বাইরে কাজে যেতেন, কাজ শেষে ১০ থেকে ১২ দিন পর আবার ফিরে আসতেন। কিন্তু এবার আর ফেরা হলো না। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো?-এই প্রশ্নেই যেন থমকে গেছে তার জীবন। তাদের ১৭ বছরের ছেলে রাকিবুল ও ১৪ বছরের মেয়ে বৃষ্টি-দুজনেই নির্বাক, যেন হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, নিহত মনিরুল ইসলামের ৮০ বছর বয়সী মা মরিয়ম বেগম ছেলের স্মৃতিচারন করছেন, আর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। সন্তানহারা মায়ের আহাজারী, ‘ও বেটা একবার ডাকো বেটা’।
তার বোন ছকিনা ভাই হারানোর শোকে প্রায় পাগলপ্রায়। কান্নার মাঝে বারবার মুরছা যাচ্ছেন।
নিহত মনিরুল ইসলামের স্ত্রী লিমা খাতুন (২২) সাত বছরের সন্তান দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র রিফাতকে পাশে নিয়ে বসে আছেন। আর তার গর্ভে রয়েছে পাঁচ মাসের আরেকটি সন্তান। কাজে বের হওয়ার সময় স্বামী বলেছিলেন, ‘বর্গা নিয়া (নেওয়া) জমিটুকুর দিকে খেয়াল রেখো।’ তার চোখে এখন শুধু অনিশ্চয়তার অন্ধকার। তার সংসারে উপার্জন করার মত কেউ নেই। কি নিয়ে বাঁচবেন, কিভাবে চলবে সংসার। নানান ভাবনায় তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
আরেক নিহত জাহিদুল ইসলামের পরিবারেও নেমে এসেছে একই শোকের ছায়া। আত্মসম্মানবোধে দৃঢ় এই পরিবার কখনো কারো কাছে হাত পাতেননি। সংসারের টানাপোড়েন সামলাতে জীবনে এই প্রথম কাজের সন্ধানে বের হয়েছিলেন এলাকার বাইরে গ্রামে শ্রমিকদের সাথে। রেখে গেছেন দুই মেয়ে, প্রথম বর্ষের ছাত্রী চাঁদনী খাতুন (১৯) এবং নবম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতি খাতুন (১৩)। তাদের চোখে এখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। স্বপ্নগুলো কি এখানেই থেমে যাবে? কে দেবেন তাদের পড়ালেখার জোগান। কে চালাবে তাদের সংসার।
তাদের এক আত্মীয় জয়তুননেছা জানান, অভাব-অনটনের মধ্যেও সততা আর পরিশ্রম দিয়েই জীবন চালিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। জীবনের তাগিদেই প্রতিবেশীদের সঙ্গে কাজের উদ্দেশ্যে এই প্রথম গ্রামের বাইরে বের হয়েছিলেন জাহিদুল ইসলাম। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, ৬ জনের মধ্যে ৩ জনই আর ফিরে এলেন না।
মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) সকালে ঘটনাস্থলেই জাহিদুল ইসলামের মৃত্যু হয়। অটোরিকশার চালকসহ আরো ৬ জন আহত হন। স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে লালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে ৫ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথে চারঘাট এলাকায় মনিরুল ইসলামের মৃত্যু হয় এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবুল আলী মারা যান। একে একে তাদের লাশ উপজেলার নগরকয়া গ্রামে পৌঁছে। এ সময় স্বজনদের আহাজারীতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।
বাদ আসর যখন জানাজার জন্য তিনটি খাটিয়া একসঙ্গে গ্রামের মাটি থেকে উঠানো হয়, তখন সেই দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক। মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোনসহ স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরে ভেল্লাবাড়িয়া শাহ বাগুদেওয়ান (রহ.) আলিম মাদ্রাসা মাঠ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে মাগরিবের আগ মুহুর্তে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
নগরকয়া গ্রাম যেন একটাই কথা বলছে, অভাবের তাড়নায় ঘর ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলো আর কখনো ঘরে ফিরবেন না। তারা রেখে গেছে শুধু কান্না, স্মৃতি আর একরাশ অপূর্ণতা।
এলাকাবাসীর দাবি, এই অসহায় দিনমজুর পরিবারগুলোর পাশে সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি-নয়তো এই কান্না আর অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘ হতে পারে।
নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল নির্দেশে দুর্ঘটনায় নিহত তিন জনসহ আহতদের পরিবারের খোঁজ খবর নেন বিএনপি নেতারা। তারা পরিবারগুলো সকল প্রকার সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হামিদুর রহমান বাবু, তাহমিদুর রহমান, শহীদুল ইসলাম, রবিউল ইসলাম রবি প্রমুখ।