বৃহস্পতিবার | ২৩ জুলাই, ২০২৬ | ৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩

পরিস্কার মানুষ পুরস্কার পায় শেষে

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে চন্দ্রিমা উদ্যান এক বিস্তৃত সবুজ চত্বর। সকাল-বিকেল সেখানে হাঁটতে আসেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ ব্যায়াম করেন, কেউ নীরবে বসে থাকেন, কেউবা ইতিহাসের কথা ভাবেন। সেই সবুজের মাঝখানে শায়িত আছেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার সমাধির চারপাশে প্রতিদিনই মানুষের ভিড় হয়। কেউ ফুল দেন, কেউ ছবি তোলেন, কেউ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকেন।
একদিন বিকেলে লেখকের সাথে সেখানে গিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র নাজমুস সাকিব। রাজনীতি নিয়ে তার ভীষণ হতাশা। চারদিকে দুর্নীতি, ক্ষমতার লড়াই, সামাজিক বিভক্তি দেখে সে মনে মনে ভাবছিল, বাংলাদেশে সৎ সাহসী নির্ভীক মানুষরা কি আদৌ কোনো মূল্য পায়?
সমাধির পাশে বসে ছিলেন একজন বৃদ্ধ। সাধারণ পোশাক, হাতে পুরোনো লাঠি। সাকিবকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বললেন, বাবা, কিছু ভাবছ? সাকিব বলল, ভাবছি, মানুষ অকাতরে নিজের জীবন বিরিয়ে দিয়ে শেষে কী পায়? ক্ষমতা? টাকা? নাকি শুধু বিতর্ক? বৃদ্ধ হেসে বললেন, তুমি এই সমাধিটার দিকে তাকাও। মানুষ কেন এখানে আসে জানো?
সাকিব উত্তর দিতে পারল না। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, আমি একসময় সেনাবাহিনীতে ছিলাম।
কাছ থেকে অনেক কিছু দেখেছি। মানুষ ভুল-শুদ্ধ মিলিয়েই ইতিহাস তৈরি করে। কিন্তু একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ শেষ পর্যন্ত কাকে বিশ্বাস করেছে। দেখো, একজন মানুষ মারা যাওয়ার বহু বছর পরও যদি দেশের রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে তাকে মানুষ স্মরণ করে, তবে বুঝবে তিনি মানুষের মনে কিছু রেখে গেছেন।
সাকিব বলল, কিন্তু তাকে নিয়েও তো বিতর্ক আছে। বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, বিতর্ক তো বড় মানুষের জীবনেই বেশি থাকে। কিন্তু ইতিহাসের বিচার কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে হয় না; হয় মানুষের স্মৃতি দিয়ে। একজন মানুষ যদি ব্যক্তিগত জীবনে সংযমী হন, রাষ্ট্রের সংকটে সাহস দেখান, দেশের মানুষের জন্য কাজ করেন, তাহলে সময় তাকে আলাদা জায়গা দেয়।
বৃদ্ধ আরো বললেন, আমি দেখেছি, অনেক ক্ষমতাবান মানুষ মৃত্যুর পর একেবারে হারিয়ে গেছে। তাদের নামে বিশাল বিলবোর্ড ছিল, গাড়ির বহর ছিল, লোকজন ছিল। কিন্তু আজ কেউ মনে রাখে না। আবার এমন মানুষও আছেন, যাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত পরিস্কার চরিত্রকেই সম্মান করে।
সাকিব চুপ করে শুনছিল। হেলে পড়া সূর্যের আলো তখন সমাধির সাদা পাথরে পড়ছিল। বৃদ্ধ বললেন, বাবা, জীবনে বড় কথা হলো, শেষে মানুষ তোমাকে কী নামে মনে রাখবে। টাকা দিয়ে ভয় কেনা যায়, ক্ষমতা দিয়ে আনুগত্য কেনা যায়, কিন্তু শ্রদ্ধা কেনা যায় না।
এই ঘটনাটি একজন তরুণ ও এক বৃদ্ধের কথোপকথন মনে হলেও এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার গভীর প্রতিচ্ছবি। আমাদের সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, তাৎক্ষণিক ক্ষমতাকে মানুষ চূড়ান্ত সাফল্য মনে করে। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পথে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে ব্যক্তির সততা, সাহস ও জনসম্পৃক্ততা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানএকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র পাঠ থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনায় তার ভূমিকা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ আছে। কিন্তু এটাও সত্য যে মৃত্যুর বহু বছর পরও তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন। তার সমাধি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মানুষের আগ্রহের জায়গা হয়ে আছে।
এর পেছনে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় নয়, ব্যক্তিত্বের একটি ভাবমূর্তিও কাজ করে।
আমাদের সমাজে পরিস্কার মানুষ বলতে শুধু দুর্নীতিমুক্ত মানুষ বোঝায় না। বোঝায় এমন মানুষকে, যার জীবনে ব্যক্তিগত সংযম, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক অবস্থান আছে। রাজনীতিতে এই গুণগুলো ক্রমশ বিরল হয়ে পড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষও এখন নেতাদের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। তারা মনে করছে, রাজনীতি মানেই সুবিধাবাদ ও ক্ষমতার খেলা।
কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। পৃথিবীর বড় বড় নেতারা শেষ পর্যন্ত স্মরণীয় হয়েছেন তাদের ব্যক্তিগত সততা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য। একজন নেতা হয়তো শতভাগ নিখুঁত নন, কিন্তু যদি তার মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও ব্যক্তিগত স্বচ্ছতার কিছু উপাদান থাকে, তবে জনগণ তাকে দীর্ঘদিন মনে রাখে।
আজকের বাংলাদেশে তরুণ সমাজের একটি বড় সংকট হলো, তারা দ্রুত সফল হওয়ার প্রবণতায় আক্রান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিলাসী জীবনযাপনকে সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। ফলে অনেকেই মনে করছে, নৈতিকতা ধরে রেখে এগোনো সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনৈতিক সাফল্য খুব দ্রুত আলোচিত হলেও তা স্থায়ী সম্মান এনে দিতে পারে না।
আমরা প্রায়ই দেখি, হঠাৎ ধনী হওয়া অনেক ব্যক্তি সমাজে প্রভাব বিস্তার করেন। কিন্তু কোনো দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই তাদের চারপাশের মানুষ সরে যায়। অন্যদিকে একজন সৎ শিক্ষক, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা কিংবা একজন নীতিবান রাজনীতিক হয়তো জীবদ্দশায় সীমিত সুযোগ পান, কিন্তু মৃত্যুর পরও মানুষ তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি রাষ্ট্র টিকে থাকে সামাজিক বিশ্বাস-এর ওপর। মানুষ যদি মনে করে, নেতারা অসৎ, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত, বিচারব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট তাহলে রাষ্ট্রের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি হয়। আর এই আস্থাহীনতা ধীরে ধীরে সমাজকে দুর্বল করে দেয়। তাই রাষ্ট্রের জন্য পরিস্কার মানুষের প্রয়োজন শুধু নৈতিক কারণে নয়, অস্তিত্বের কারণেও।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখন ব্যক্তিপূজা বেশি, আত্মসমালোচনা কম। অথচ একজন নেতার প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার চরিত্র, সিদ্ধান্ত ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে। একজন মানুষ ক্ষমতায় থাকলে তাকে ঘিরে লোকজন থাকবেই। কিন্তু মৃত্যুর পরও যদি সাধারণ মানুষ তাকে স্মরণ করে, তবে সেটিই আসল বিষয়।
চন্দ্রিমা উদ্যানের সেই সমাধিতে প্রতিদিন যারা যান, তাদের সবাই একই রাজনৈতিক মতাদর্শের নন। কেউ ইতিহাস জানতে যান, কেউ কৌতূহলবশত যান, কেউ শ্রদ্ধা জানাতে যান। কিন্তু এই উপস্থিতি একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়, মানুষ শেষ পর্যন্ত তার কাজ, চরিত্র ও স্মৃতির মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে।
আজকের তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে এই যে, সৎ মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়, অবহেলা সহ্য করতে হয়, কষ্ট পেতে হয়। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পথে তারাই টিকে থাকে। মরহুম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সমাধি যেন আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস অমর। আর তাই শেষ পর্যন্ত পরিস্কার মানুষই পুরস্কার পায়। কেউ পায় মানুষের ভালোবাসায়, কেউ ইতিহাসের শ্রদ্ধায়, কেউ একটি জাতির স্মৃতিতে।
সেদিন ওর সাথে বাসায় ফিরে আসার পর আমার নানা কথা মনে ঘুরপাক খেতে লাগলো। মনে পড়ল আমাদের শৈশবে মফস্বল শহরের সরকারি অফিসে কাজ করতেন সুফিয়ান চাচা। পদমর্যাদায় তিনি বড় কেউ ছিলেন না; হিসাব বিভাগের সাধারণ একজন সহকারী। অফিসে তার পরিচয় ছিল অতি সৎ মানুষ হিসেবে। সহকর্মীরা অনেকে তাকে সম্মান করলেও ভেতরে ভেতরে হাসাহাসি করত। কারণ, তিনি ঘুষ নিতেন না, অপ্রয়োজনীয় সুবিধা গ্রহণ করতেন না, এমনকি অফিসের একটি কাগজও বাসায় নিয়ে যেতেন না।
অন্যদিকে তার চারপাশে তখন অন্য এক সংস্কৃতি চলছিল। কেউ নতুন বাড়ি বানাচ্ছে, কেউ জমি কিনছে, কেউ বিদেশে টাকা পাঠাচ্ছে। চাচী মাঝেমধ্যে কষ্ট করে বলতেন, সবাই যদি পারে, আপনি কেন পারবেন না? চাচা চুপ করে থাকতেন। শুধু বলতেন, অন্যায় টাকায় শান্তি আসে না।
একদিন অফিসে বড় ধরনের দুর্নীতির তদন্ত শুরু হলো। বহু কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাব জব্দ হলো, কয়েকজন গ্রেপ্তারও হলো। তদন্তকারী দল যখন কাদের সাহেবের ফাইল ঘাঁটল, তখন তারা বিস্মিত হলো। ত্রিশ বছরের চাকরিজীবনে তার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগও নেই। আয়-ব্যয়ের হিসাব স্বচ্ছ।
এমনকি পুরোনো একটি কলম কেনার রশিদও তিনি ফাইলে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। কয়েক মাস পরে সরকার তাকে সাদা মনের মানুষ হিসেবে ‘সততা পদক’ দিল। শহরের মানুষ যারা একসময় তাকে নিয়ে হাসত, তারাই এখন সন্তানদের উদাহরণ দেয়, সুফিয়ান সাহেবের মতো মানুষ হও।
তার মেয়ে পরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হলো। ছেলেও চিকিৎসক হলো। জীবনের শেষ বয়সে কাদের সাহেব বলেছিলেন, পুরস্কারটা পদক না, মানুষের বিশ্বাস।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও আমাদের এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলেছে। কে কত বিলাসী জীবনযাপন করছে, কে কত দ্রুত ধনী হচ্ছে, তা নিয়েই যেন মূল্যায়ন। এই সংস্কৃতি তরুণদের মধ্যেও এক ধরনের হতাশা তৈরি করছে। আমাদের পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থাতেও এই মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা জরুরি। আজ আমাদের প্রয়োজন নতুন করে পরিস্কার মানুষ তৈরির সামাজিক আন্দোলন। যেখানে সততাকে দুর্বলতা নয়, শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যেখানে শিশুরা শিখবে, মানুষ বড় হয় শুধু অর্থে নয়, নৈতিকতায়ও।
সুফিায়ান চাচার জীবনের গল্পের মতো বাস্তব জীবনেও অনেক মানুষ আছেন যারা নীরবে সৎ থেকে যাচ্ছেন। আবার বিগত বছরগুলোতে মরহুম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকে চোখের আড়াল করা, অবদানকে খাটো করার জন্য তার বর্তমান সমাধিকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করার কত অপপ্রচার ও হীন প্রচেষ্টাই না চালানো হয়েছে। কিন্তু তিনি টিকে আছেন মানুষের মনের কোঠায়, তাঁর কাজের মাধ্যমে। চন্দ্রিমা উদ্যানে তাঁর সমাধি এবং পার্শ্বে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সমধি ভাল কাজের পুরস্কার হিসেবে জাতির হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এভাবে হাজারো ভালো মানুষ কারণ শেষ পর্যন্ত পরিস্কার মানুষই পুরস্কার পায়, কখনো রাষ্ট্রের পদকে, কখনো মানুষের ভালোবাসায়, কখনো সন্তানের গর্বে, আবার কখনো ইতিহাসের শ্রদ্ধায়।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.