
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
১৯৮৬ সালের গরমকালে এক দুপুরের কথা। এক বিত্তশালী আত্মীয়ের বাসায় মধ্যাহ্নভোজ শেষে তার মতো একজন অতিথিকে শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে এসি ছেড়ে দিয়ে বলা হয়েছিল, ‘এখানে ঘুমাও। ঠান্ডা লাগলে পাশের কাঁথাটা গায়ে দিও! একটু থেমে আবার কথা যোগ করে বলেছিল, ওটা এসি চালানোর সময় ব্যবহার করার জন্য কেনা দামী নকশীকাঁথা!
কয়েক যুগ আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন গরমের সময় এলেই এই গল্পটি শোনাতেন আমাদের হলের সিনিয়র রুমমেট জামান ভাই। গরমের দুপুরে তাঁর এসি চালিয়ে কাঁথা গায়ে জড়িয়ে ঘুমানোর কথা শুনে আমরা তখন অনেক হেসেছি। অনেকটা বিস্মিত হয়েছি, আর ভেবেছি, বিলাসিতারও বুঝি এমন বিচিত্র রূপ আছে!
কিন্তু সময় বদলেছে, আর সেই গল্পের তাৎপর্যও বদলে গেছে। একসময় যে ঘটনা ছিল রসিকতার, আজ তা হয়ে উঠেছে বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। নগরজীবনে এসি এখন আর বিলাসের বস্তু নয়। এসির ব্যবহার এখন অনেকের জীবন-যাপনে প্রয়োজনের অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে এটি অযৌক্তিক ভোগে পরিণত হয়, যেখানে ঘরকে এতটাই ঠান্ডা করা হয় যে কাঁথা গায়ে দিতে হয়। বর্তমান নগর সভ্যতায় এই ‘এসি-নকশীকাঁথা’ সংস্কৃতি আসলে আমাদের ভোগবাদী মানসিকতা পেরিয়ে ঘরে ঘরে অপচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। তা হচ্ছে, আমরা কি স্বস্তির জন্য প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নিজেদের জন্য অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করছি? এসির ঠান্ডা আর কাঁথার উষ্ণতার এই অদ্ভুত সমন্বয় যেন এক ধরনের আত্মবিরোধিতা, যেখানে আমরা নিজেরাই সমস্যা তৈরি করে আবার তার সমাধান খুঁজছি।
এই প্রবণতার আরেকটি দিক হলো সামাজিক বৈপরীত্য। একদিকে এক শ্রেণি কৃত্রিমভাবে তৈরী অতিরিক্ত শীতলতায় নকশীকাঁথা গায়ে দেয়, অন্যদিকে আরেক শ্রেণি গরমে হাঁসফাঁস করে। এই ব্যবধান শুধু আয়-ব্যয়ের নয়; এটি সংবেদনশীলতারও। কারণ, বিত্তশালী কারো কারো ভোগের মাত্রা যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়, তখন তা নিম্নশ্রেণির মানুষের কষ্টের বাস্তবতাকেও অস্বীকার করে।
রাজধানী ঢাকার গরম এখন আর ঋতুভিত্তিক কোনো প্রাকৃতিক নিয়মে আসে না। এটি ধীরে ধীরে এক ধরনের নগর-নির্মিত বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। কংক্রিটের জঙ্গল, সবুজের সংকোচন, যানবাহনের ধোঁয়া আর অব্যবস্থাপিত নগরায়নের ফলে তাপমাত্রা যেন নিজের নিয়মেই বাড়ছে। এই বাস্তবতায় স্বস্তি খোঁজার সবচেয়ে সহজ উপায় হিসেবে উঠে এসেছে এয়ার কন্ডিশনার, এসি। এই এসি ব্যবহারের স্বস্তি কি প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম করে বিলাসিতায় রূপ নিচ্ছে? বিশেষ করে যখন দেখা যায়, এসির শীতলতায় মানুষ কোট-টাই পরে অফিস করছে অথবা বাসায় দিনে রাতে কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাচ্ছে তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ না হয়ে, সামাজিক ও নৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়ে যাচ্ছে !
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে পৃথিবীর নানা দেশে যখন জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে, সরকারগুলো বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে, তখন ঢাকার এক শ্রেণির মানুষের এই ‘এসি-কাঁথা সংস্কৃতি’ নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ।
আমরা জানি, শহুরে জীবনে বহুতল অফিস ভবন অথবা ঘিঞ্জি দালান কোঠায় তীব্র গরমে এসি ব্যবহারকে এখন আর অপ্রয়োজনীয় বলা যায় না। কিন্তু যখন একটি ঘরকে অতিরিক্ত ঠান্ডা করে কাঁথা গায়ে দিতে হয়, তখন সেটি আর প্রয়োজন থাকে না। তখন এটি পরিণত হয় এক ধরনের অযৌক্তিক বিলাসে। এই বিলাসিতার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ভোগের মাত্রা বাড়বে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভোগ যদি যুক্তি ও প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটি সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, সচেতনতার অভাবও একটি বড় কারণ। অনেকেই জানেন না, একটি এসি যদি ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চালানো হয়, তবে সেটি কত বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে। অথচ ২৫ বা ২৬ ডিগ্রিতে সেটি চালালেও স্বস্তি পাওয়া সম্ভব।
গত আড়াই মাস ধরে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভয়ংকর যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নানা সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে। উন্নত দেশগুলো পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ, যা এখনও জ্বালানি আমদানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল, সেখানে দোকানে অতিরিক্ত পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে আলোকসজ্জা, অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় এক ধরনের আত্মঘাতী প্রবণতা। বিত্তশালীদের ঘরে ঘরে এই এসি-কাঁথা সংস্কৃতি একদিকে যেমন বিদ্যুতের অপচয় ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে এটি বৈষম্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। শহরের এক অংশ যখন অতিরিক্ত শীতলতায় কাঁথা গায়ে দিচ্ছে, তখন অন্য অংশ বিদ্যুতের অভাবে অন্ধকারে থাকছে বা আর্থিক সীমাবদ্ধতায় পাখা চালাতেও হিমশিম খাচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশগত প্রভাব। এসি ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ে, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। এর ফলে কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করে। প্যারাডক্সিক্যালি, আমরা গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে এমন কিছু করছি, যা ভবিষ্যতে গরমকে আরও তীব্র করে তুলবে।
এই সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র সরকারের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। এটি একটি সামাজিক আচরণের পরিবর্তনের বিষয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। যেমন, এসি ২৫-২৬ ডিগ্রিতে সেট করা, প্রয়োজন ছাড়া এসি চালু না রাখা, ঘরকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা করা, ইত্যাদি।
একই সঙ্গে স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।েএজন্য জাপানের মতো ‘মিরাই নো উচি’ ভবিষ্যতের বাড়ি এমনভাবে ভবন নির্মাণ করতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক বাতাস ও আলো ব্যবহার করে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এজন্য সরকারেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রয়োজনে নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। তবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আগে প্রয়োজন সামাজিক উপলব্ধি তৈরি করা যাতে মানুষ নিজ থেকেই সংযমী হয়।
আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের সমাজে একসময় মিতব্যয়িতা একটি মূল্যবোধ হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন সেটি অনেকাংশে বিলীন হয়ে গেছে। তার জায়গা নিয়েছে প্রদর্শনমূলক ভোগ। এসি চালিয়ে কাঁথা গায়ে দেওয়া যেন এক ধরনের ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে শুধু আইন করে বা প্রচারণা চালিয়ে খুব বেশি পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
বর্তমান সময়ে মানুষ যেখানে একদিকে অনেকে মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে অন্যদিকে এই ধরনের বিলাসী সংস্কৃতি আমাদের মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই এ সমস্যার সমাধানে কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ জরুরি। যেমন’ প্রথমত, সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু-কিশোরদের মাঝে সংযম ও সঞ্চয়ের শিক্ষা দিতে হবে। বিলাসিতার চেয়ে প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যমেও এ বিষয়ে ইতিবাচক প্রচারণা চালানো যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। পাশাপাশি আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকদের উচিত শক্তিশালী নীতি গ্রহণ করা, যাতে অতিরিক্ত বিলাসী পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত হয় এবং প্রয়োজনীয় খাতে বিনিয়োগ বাড়ে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি বাস্তবায়নও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাঁথা গায়ে দেয়া ’এসি সংস্কৃতি’ সরাসরি জ্বালানি অপচয়ের সঙ্গে যুক্ত। গরম কমানোর জন্য এসি হয়তো একটি তাৎক্ষণিক সমাধান, কিন্তু সেটিকে যুক্তিসংগত সীমার মধ্যে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
তাই সময় এসেছে নিজেকে প্রশ্ন করার: আমরা কি সত্যিই স্বস্তি খুঁজছি, নাকি বিলাসিতার নামে অপচয়ের এক অন্ধ দৌড়ে ছুটছি? চলমান ইরান-মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক জ্বালানী সংকটের এই সময়ে এসির কাঁথা আমাদের চিন্তা, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সেই বার্তাটি যদি আমরা এখনই বুঝতে না পারি, তবে ভবিষ্যতের মূল্য হয়তো আরও বেশি চড়া হবে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীণ আমাদের জামান ভাইয়ের সেই গল্পটি তাই এখন আর কেবল হাসির উপাখ্যান মনে হচ্ছে না। সেটা একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি মানসিকতার আয়না হলেও বর্তমান জ্বালানী সংকট সময়ে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তি যতই এগোক, সংযম আর সচেতনতা না থাকলে সেই অগ্রগতি আমাদেরকে অদ্ভুত বদভ্যাস ও অপচয়ের জীবনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]