বৃহস্পতিবার | ১৬ জুলাই, ২০২৬ | ১ শ্রাবণ, ১৪৩৩

শিরোনাম
জুলাই শহীদ দিবস পালন জুলাই-৩৬ ও প্রাণ হারানো শিশুদের মূল্য লাল ও হলুদ কার্ড ও আমাদের সমাজ বড়াইগ্রামে জুলাই শহিদ দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন জলাবদ্ধতা সৃষ্টিতে জর্জরিত বনপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ছায়া প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে তাপপ্রবাহে করণীয় ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মশালা অনুষ্ঠিত। নাটোরে আদম আলী শিক্ষা বৃত্তির অর্থ, সনদ ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ লালপুরে একতা এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত, ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ বন্ধ বন্যা মোকাবিলায় লালপুরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা নাটোরে রান্নাঘরে গোখরা সাপের ৩০টি বাচ্চা, আতঙ্কে পরিবার

লাল ও হলুদ কার্ড ও আমাদের সমাজ

-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এই খেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান হলো হলুদ কার্ড ও লাল কার্ড। হলুদ কার্ড একজন খেলোয়াড়কে সতর্ক করে দেয় যে তিনি নিয়ম ভঙ্গ করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে লাল কার্ড বোঝায় গুরুতর অপরাধ বা বারবার নিয়ম লঙ্ঘনের ফলে মাঠ থেকে বহিষ্কার। খেলার শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ন্যায়সঙ্গত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার জন্য এই দুটি কার্ডের ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু বিষয়টি বাস্তবে শুধু খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের দর্শন গভীর তাৎপর্য বহন করে।
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যেখানে নিয়ম লঙ্ঘন, দায়িত্বহীনতা, দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা এবং সামাজিক অবক্ষয়ের নানা চিত্র প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে। আইন রয়েছে, বিধি রয়েছে, নৈতিকতার শিক্ষা রয়েছে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এগুলোর যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। ফলে অপরাধ ও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের ধারণা কেবল একটি ক্রীড়া নিয়ম-নীতির বাইরেও শিক্ষণীয় হয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
একটি সভ্য সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভুল সংশোধনের সুযোগ প্রদান। প্রত্যেক মানুষই ভুল করতে পারে এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ পাওয়া তার অধিকার। হলুদ কার্ড সেই মানবিক সুযোগের প্রতীক। এটি মানুষকে সতর্ক করে, তার দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ করে দেয়। কিন্তু যখন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বারবার একই ধরনের অপরাধ বা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে এবং সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। লাল কার্ড সেই কঠোরতার প্রতীক, যা শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন।
তাই একটি সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক এবং দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের জন্য হলুদ কার্ড ও লাল কার্ড উভয়েরই প্রয়োজন রয়েছে। একদিকে যেমন সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে, অন্যদিকে তেমনি অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যই পারে সমাজে শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। আজকের বাস্তবতায় তাই হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের প্রেক্ষিত ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
ফুটবলের শুরুর যুগে হলুদ বা লাল কার্ডের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। রেফারিরা মৌখিকভাবে খেলোয়াড়দের সতর্ক করতেন কিংবা মাঠ থেকে বের করে দিতেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভাষাগত সমস্যার কারণে প্রায়ই বিভ্রান্তি তৈরি হতো। একজন রেফারি কী সিদ্ধান্ত দিলেন, খেলোয়াড় বা দর্শক অনেক সময় তা বুঝতে পারতেন না। ফলে উত্তেজনা, বিতর্ক এবং সংঘাতের সৃষ্টি হতো।
এই সমস্যার সমাধানের চিন্তা প্রথম আসে ইংল্যান্ডের রেফারি কেন অ্যাস্টন-এর মাথায়। ১৯৬৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার একটি বিতর্কিত ম্যাচে তিনি লক্ষ্য করেন, রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। পরে একদিন গাড়ি চালানোর সময় ট্রাফিক সিগন্যাল দেখে তার মাথায় নতুন ধারণা আসে। তিনি ভাবলেন, যেমন ট্রাফিক লাইটে হলুদ রঙ সতর্কবার্তা এবং লাল রঙ থামার নির্দেশ দেয়, তেমনি ফুটবলেও দুটি রঙের কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় হলুদ ও লাল কার্ডের ধারণা।
১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে হলুদ ও লাল কার্ড চালু করা হয়। তখন থেকেই ফুটবলের নিয়ম-কানুনে এক নতুন যুগের সূচনা ঘটে। হলুদ কার্ড সতর্কবার্তার প্রতীক হিসেবে এবং লাল কার্ড বহিষ্কারের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ধীরে ধীরে এটি ফুটবলের অন্যতম অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়।
আমাদের সমাজে এই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। আমরা প্রায়ই দেখি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি বা দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। তদন্ত কমিটি গঠন হয়, নোটিশ দেওয়া হয়, নির্দেশনা জারি করা হয়। কিন্তু অনেক সময় এগুলো কেবল কাগজে- কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলস্বরূপ, অপরাধীরা ধরে নেয় যে হলুদ কার্ডই শেষ কথা, লাল কার্ডের কোনো বাস্তবতা নেই।
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাত এর একটি বড় উদাহরণ। দুর্ঘটনার পরপরই নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়, চালকদের সতর্ক করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। কারণ সতর্কবার্তার সঙ্গে ধারাবাহিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয় না। ফলে হলুদ কার্ডের কার্যকারিতা হারিয়ে যায়।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও হলুদ ও লাল কার্ডের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রে জনগণই প্রকৃত রেফারি। নির্বাচনের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মূল্যায়ন করে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনগণ প্রথমে অসন্তোষ প্রকাশ করে যেটা এক অর্থে হলুদ কার্ড। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে ভোটের মাধ্যমে জনগণ লাল কার্ডও দেখাতে পারে। গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই যে জনগণের হাতে শেষ সিদ্ধান্তের ক্ষমতা থাকে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও হলুদ ও লাল কার্ডের শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। একজন শিক্ষক যদি কোনো শিক্ষার্থীর ভুল ধরিয়ে দেন, সেটি হলো হলুদ কার্ড। উদ্দেশ্য তাকে অপমান করা নয়, বরং সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। কিন্তু বারবার একই ভুল করলে শাস্তির প্রয়োজন হতে পারে। শিক্ষার মূল দর্শনও হলো সংশোধন ও উন্নয়ন।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই উল্টো চিত্র দেখি। এখানে অনেক সময় কাউকে কোনো ভুলের জন্য প্রথমেই লাল কার্ড দেখিয়ে দেওয়া হয়। সত্যতা যাচাইয়ের আগেই তাকে সামাজিকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এর ফলে ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের সঠিক ক্রম এবং ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বারবার সতর্ক করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। খাদ্যে ভেজাল, সড়কে বেপরোয়া যান চলাচল, সরকারি সম্পদের অপচয়, পরিবেশ দূষণ কিংবা প্রশাসনিক দুর্নীতির মতো সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে। কারণ অনেকেই মনে করে, সতর্কবার্তার পর আর কোনো শাস্তি হবে না। ফলে হলুদ কার্ডের কার্যকারিতা হারিয়ে যায়।
এখানেই লাল কার্ডের প্রয়োজনীয়তা। সমাজে শৃঙ্খলা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সতর্কবার্তার পাশাপাশি কঠোর জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। যারা বারবার আইন ভঙ্গ করে, জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন করে বা অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় অপরাধের সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে এবং সৎ মানুষ নিরুৎসাহিত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভুয়া তথ্য প্রচার, অনলাইন প্রতারণা, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং চরিত্রহননের ঘটনা বাড়ছে। কারণ, সমাজ বা রাষ্ট্র কোথাও কোন ফায়ারওয়াল নেই, নেই কোন নিয়ন্ত্রণ। এসব ক্ষেত্রে প্রথমে সচেতনতা ও সতর্কতা প্রয়োজন হলেও পুনরাবৃত্ত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
শিক্ষা ও পরিবারেও হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের ভারসাম্য প্রয়োজন। সন্তান বা শিক্ষার্থী কোনো ভুল করলে তাকে বুঝিয়ে বলা, পরামর্শ দেওয়া এবং সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু যদি দায়িত্বহীনতা বা অসদাচরণ বারবার ঘটে, তাহলে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। কারণ সীমাহীন ছাড় শৃঙ্খলা গড়ে তোলে না; বরং দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হলুদ কার্ড ও লাল কার্ডের প্রয়োগ হতে হবে ন্যায়সঙ্গত, নিরপেক্ষ এবং সবার জন্য সমান। সমাজে যদি প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শাস্তির বাইরে থেকে যায়, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। শৃঙ্খলা তখন আর ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নয়, বরং ক্ষমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। তাই একটি সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গঠনের জন্য হলুদ কার্ড ও লাল কার্ড উভয়েরই প্রয়োজন রয়েছে। হলুদ কার্ড মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেয়, আর লাল কার্ড নিশ্চিত করে যে নিয়ম ভঙ্গের পরিণতি আছে। এই দুইয়ের সুষম প্রয়োগই পারে আমাদের সমাজে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং আইনের শাসনকে আরও শক্তিশালী করতে।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.