
নিজস্ব প্রতিবেদক :
রাজশাহী শাহমখদুম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী লেখক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. তসিকুল ইসলাম রাজা আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
সোমবার (১৮ মো ২০২৬) রাত ৮টার দিকে রাজধানী ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি ঢাকায় ছেলের বাসায় অবস্থান করছিলেন। তিনি এক ছেলে, এক মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও শিক্ষার্থী রেখে গেছেন।
ড. রাজার স্বজনেরা জানান, তাঁর মেয়ে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন। তিনি মঙ্গলবার রাতে দেশে পৌঁছাতে পারেন। এ কারণে ড. রাজার মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বুধবার ড. রাজার মরদেহ রাজশাহীতে আনা হবে। পরে বাদ আসর নগরের মহিষবাথান কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
ড. তসিকুল ইসলাম রাজা ছিলেন একজন প্রতিবাদী কবি, নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। আধুনিক বাংলা কবিতা, লোকসংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষণায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে তিনি একজন নিরলস কর্মী ও মুক্তবুদ্ধির চর্চক হিসেবে সারা দেশে সুপরিচিত ছিলেন।
ড. রাজার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টিরও বেশি। শতাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-‘বাসর ফেলে যুদ্ধে আয়’, ‘নেই রক্ষা নেই’, ‘রবীন্দ্রোত্তর বাংলাকাব্যে গ্রামীণ জীবন’, ‘রবীন্দ্রনাথের লোকায়ত জীবন ও সংস্কৃতি ভাবনা’, ‘বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতি চর্চার ইতিবৃত্ত ও অন্যান্য প্রবন্ধ’, ‘মনীষী ও গুণীজন স্মরণে’, ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’, ‘ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা’, ‘আমার লোকসংস্কৃতি ভাবনা’, ‘রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন’, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে ভাষা আন্দোলন’, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস’, ‘বাংলাদেশ এবং বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি’সহ বহু গবেষণাধর্মী ও স্মারকগ্রন্থ।
সাহিত্য, গবেষণা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ড. তসিকুল ইসলাম রাজা বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পুরস্কারে ভূষিত হন। এর মধ্যে রয়েছে কবি বন্দে আলী মিয়া সাহিত্য পদক (১৯৯৫), জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজশিক্ষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি, নলতা কচি-কাঁচার মেলা সাহিত্য স্বর্ণপদক (২০০৯), কবিকুঞ্জ পদক (২০১৩), ঋত্বিক ঘটক সম্মাননা পদক (২০১৮), অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় সম্মাননা পদক (২০১৯), বাংলা একাডেমির সা’দাত আলী আকন্দ সাহিত্য পুরস্কার (২০২১) এবং রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা পুরস্কার ও পদক (২০২২) ইত্যাদি।
ড. তসিকুল ইসলাম রাজা বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ইতিহাস ও সংস্কৃতি গবেষণা পরিষদের আজীবন সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৫৩ সালের ১১ জানুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বালিয়াঘাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রাজশাহী কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘যুদ্ধোত্তর বাংলাকাব্যে গ্রামীণ জীবন’।
শিক্ষকতা জীবনে ড. রাজা ১৯৮৩ সালে রাজশাহী মহানগরীর শাহমখদুম ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাজ্জাদ আলীর সন্তান তিনি।
ড. তসিকুল ইসলাম রাজার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম ডেইজী। সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন মেয়ে ফাতিমাতুজ জোহরা সেঁওতি ও ছেলে সাফিন ইসলাম। এ ছাড়া তিনি জামাতা আরিফুর রহমান জনি, পুত্রবধূ রওনক জাহান নিতু এবং দুই নাতি অদ্রিক ও অরিত্রকে রেখে গেছেন।
ড. তসিকুল ইসলাম রাজার মৃত্যুতে রাজশাহীর সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও গবেষণা অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।