
-প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম।
জুলাই-৩৬ (২০২৪)-এর ঘটনাবলি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গভীরভাবে আলোচিত একটি অধ্যায়। আন্দোলন, সংঘর্ষ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষের মুখোমুখি অবস্থানের মধ্যে সে সময় বহু প্রাণহানি ঘটে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এসব ঘটনায় প্রাপ্ত বয়স্ক ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা প্রকাশিত তথ্যে অন্তত ৬৫ জন শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই-৩৬ এমন এক অধ্যায়, যা বহু বছর ধরে গবেষণা, বিচার ও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে। চাকুরীতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, কারফিউ ও যোগাযোগব্যবস্থার অচলাবস্থার মধ্যে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। আর এই সাধারণ মানুষের মধ্যেই ছিল অসংখ্য শিশু, যাদের কেউ স্কুলে যাচ্ছিল, কেউ বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, কেউ পরিবারের সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত তাদের জন্য হয়ে ওঠে মৃত্যুর ফাঁদ।
জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত দিনগুলোকে অনেকে আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত ভয়াবহ ঘটনার সাথে হিসেব কষে প্রতীকীভাবে ৩৬ জুলাই নামে অভিহিত করেন। এটি ক্যালেন্ডারের কোনো বাস্তব দিন নয়। তবে এটা এমন এক সময়ের প্রতীক, যখন মনে হয়েছিল সহিংসতার শেষ নেই। সেই প্রতীক আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে ব্যর্থ হয়, যখন তার শিশুরা সংঘাতের শিকার হয়।
পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তদন্ত, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে শিশু হতাহতের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর সহিংসতায় অন্তত ৬৫ জন শিশু নিহত হয়েছিল বলে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে। এই সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান হলেও এটি ৬৫টি পরিবারের চিরস্থায়ী শোক, ৬৫টি অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং একটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়ের প্রতীক। তবে এ-ও মনে রাখা প্রয়োজন যে, ঘটনাটির বিভিন্ন উৎসে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা রয়েছে এবং চূড়ান্ত দায় নির্ধারণের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের গুরুত্ব অপরিসীম।
একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই রাজনৈতিক লাভ-লোকসানের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। শিশুরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নয়, তারা কোনো রাষ্ট্রীয় নীতির নির্মাতা নয়, কোনো আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণকারীও নয়। তবুও প্রায় সব সংঘাতেই তারাই সবচেয়ে বড় মূল্য দেয়। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের বহু দেশের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে।
বাংলাদেশ শিশু অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের (কনভেনশন অন দ্য রাইটস্ অব দ্য চাইল্ড) পক্ষভুক্ত। এই সনদ রাষ্ট্রকে প্রতিটি শিশুর জীবন, নিরাপত্তা ও বিকাশ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা দেয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, জননিরাপত্তা রক্ষার সময়ও বলপ্রয়োগ হতে হবে প্রয়োজনীয়, আইনসম্মত ও আনুপাতিক। তাই সংঘাতের সময় শিশু নিহত হওয়ার প্রতিটি ঘটনাই গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
জুলাই-৩৬ এর ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেন সেসময় শিশুরা নিরাপদ থাকতে পারল না? তারা কি সংঘর্ষস্থলে ছিল, নাকি নিজ নিজ বাসাবাড়িতে? নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি ছিল? আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কৌশলে কী ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল? রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি যথাসময়ে উত্তেজনা প্রশমনে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিল? বাসায় থেকেও কেন তাদের অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর শিক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে একটি মানবিক নীতি আমাদের মেনে চলতে হবে। আর তা হলো, প্রতিটি শিশুর জীবন সমান মূল্যবান। কোনো শিশুর মৃত্যুকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা যায় না। যে পরিবার সন্তান হারিয়েছে, তাদের কাছে কোনো রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সান্ত্বনা হতে পারে না। তাদের একমাত্র দাবি সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার এবং এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত অপরিহার্য। তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ, দায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা চিহ্নিত করতে হবে। যেখানে আইন লঙ্ঘিত হয়েছে, সেখানে আইনের শাসনের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
শুধু বিচার নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যথাযথভাবে পুনর্বাসন করাও জরুরি। সন্তান হারানো কোনো পরিবারের ক্ষতি অর্থ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা, শিক্ষা সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মাধ্যমে পাশে দাঁড়াতে পারে। এটি দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
জুলাই-৩৬ আমাদের আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে তা হলো, রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কখনো সহিংসতায় হয় না। সংলাপ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতার ভিত্তি। যখন সংলাপ ব্যর্থ হয়, তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের; আর সেই ক্ষতির সবচেয়ে নির্মম রূপ দেখা যায় শিশুদের ওপর।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে যাচাইবিহীন তথ্য, গুজব বা উসকানিমূলক প্রচারণা সহিংসতা বাড়াতে পারে। আবার তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা সত্য উদ্ঘাটন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুদের ছবি, পরিচয় ও ব্যক্তিগত মর্যাদা রক্ষাও সংবাদ পরিবেশনের একটি মৌলিক নৈতিক দায়িত্ব।
এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও শান্তি, সহনশীলতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে এমন একটি সংস্কৃতি শেখাতে হবে, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু শিশুর জীবন কখনো ঝুঁকির মুখে পড়বে না।
কোমলমতি শিশুদেরকে কোনভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদেরও ভবিষ্যতের জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জনসমাবেশ ব্যবস্থাপনা, সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শিশু ও বেসামরিক নাগরিক সুরক্ষার বিশেষ প্রটোকল এবং দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আন্দোলন বা কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিতে পরিণত না হয়।
রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্যও জুলাই-৩৬ একটি কঠিন শিক্ষা। রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান, কার্যকর সংলাপ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। কারণ একটি শিশুর জীবন হারানো মানে কেবল একটি বর্তমানের সমাপ্তি নয়; একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতেরও মৃত্যু।
আজ প্রয়োজন শিশুকল্যাণে জাতীয় ঐকমত্য তৈরী করা। শিশুদের প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা কোনো দলের নয়, পুরো জাতির ক্ষতি। তাই এ বিষয়ে রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবিক অবস্থান একটাই হওয়া উচিত। আর তা হলো, কোনো অপঘাত বা হিংস্রতায় শিশুর মৃত্যু আর নয়।
ইতিহাসের প্রতিটি বেদনাদায়ক অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকে। জুলাই ৩৬-এর ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়। যদি আমরা সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি, বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে এই ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিতে পারি, তবে নিহত শিশুদের স্মৃতির প্রতি সেটিই হবে সর্বোচ্চ সম্মান। কারণ, একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় তার উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সে তার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় কিন্তু দুর্বল নাগরিক কচিপ্রাণ শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত। জুলাই বিপ্লব ২০২৪-এর রক্তাক্ত স্মৃতি আমাদের সেই কঠিন সত্যই আবারও মনে করিয়ে দেয়।
এতগুলো প্রাণ হারানো শিশুদের কথা আমাদের জাতীয় জীবনে বার বার স্মরণে ফিরে আসবে কিন্তু তাদের মূল্যবান জীবন ফিরে আসবে না। কিন্তু তাদের স্মৃতি আমাদের ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ, রাজনীতি এবং মানবিক মূল্যবোধকে আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে। একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল তার উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিচার করা যায় না। যে কোন রাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে অসহায় নাগরিক তথা শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে, সকল নাগরিকের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় কতটা শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারে তার বাস্তব প্রতিচ্ছবির মধ্যে মধ্যেই সেই উত্তর নিহিত রয়েছে। সেই নতুন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই এখন বাংলাদেশের নতুন দায়িত্বশীলদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
* প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন। E-mail: [email protected]