রবিবার | ৭ জুন, ২০২৬ | ২৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

শিরোনাম

লালপুরে নেই জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী, বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভপাত

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ :
নাটোরের লালপুর উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের ঘটনা বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গরিব, দিনমজুর ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবাগ্রহীতারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ৭০ হাজার ৬৮১ জন সক্ষম দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আওতায় রয়েছেন। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৪৫৮ জন নারী মুখে খাওয়ার ‘সুখী’ বড়ি, ৬ হাজার ১০২ জন কনডম, ১১ হাজার ২৮ জন ইনজেকশন, ৯৯৭ জন কপার টি, ৩ হাজার ৯৮০ জন ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করেন। কিন্তু ২০২৪ সালের শুরু থেকে ধীরে ধীরে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট দেখা দিতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। বর্তমানে উপজেলায় সরকারি পর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণের কোনো সামগ্রীর মজুদ নেই। ফলে পরিবার কল্যাণ ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলায় কর্মরত পরিবার কল্যাণ সহকারী (এফডব্লিউএ) হাবিবা খাতুন বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর অভাবে তার কর্ম এলাকায় ৪৫ বছরের বেশি বয়সী একাধিক নারীর অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা ঘটেছে। পরে তাদের মধ্যে কেউ কেউ গর্ভপাত করাতে বাধ্য হয়েছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি অনেক পরিবারের জন্য সামাজিক ও মানসিকভাবে বিব্রতকর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার উধনপাড়া গ্রামের ৪৪ বছর বয়সী এক নারী জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরকারিভাবে সরবরাহকৃত জন্মনিয়ন্ত্রণ ইনজেকশন গ্রহণ করতেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে ইনজেকশন না পাওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গর্ভধারণ করেন। পরে গর্ভপাত করালেও বর্তমানে তিনি বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একাধিক নারী জানান, গ্রামের অনেক দম্পতির পক্ষে বাজার থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কিনে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে স্বামীরাও এসব পদ্ধতি গ্রহণ বা কিনে আনার বিষয়ে আগ্রহ দেখান না। ফলে তারা পুরোপুরি সরকারি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রায় দেড় বছর ধরে পরিবার কল্যাণ সহকারীরা বাড়িতে এলেও ট্যাবলেট ও কনডম সরবরাহ করতে পারছেন না। এতে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. তপন কুমার রায় বলেন, দেশের গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং জন্মনিরোধক সামগ্রীর ক্ষেত্রে সরকারি সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন এ ধরনের সেবা ও সামগ্রীর ঘাটতি থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত এবং জন্মহার বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএফপিও) মো. রায়হানুল হক বলেন, মাঠ পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতি হিসেবে কনডম, মুখে খাওয়ার বড়ি ও ইনজেকশন এবং দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি হিসেবে ইমপ্ল্যান্ট ও কপার-টি (আইইউডি) বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া স্থায়ী পদ্ধতি হিসেবে নারী ও পুরুষ বন্ধ্যাকরণ বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব সামগ্রীর সরবরাহ না থাকায় মাঠকর্মীরা বর্তমানে কেবল পরামর্শ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তিনি আরও বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটের পাশাপাশি জনবল সংকটও রয়েছে। ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে এবং স্বাভাবিকের তুলনায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনা বাড়ছে। দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সচল রাখতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে দ্রুত জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।

স্বত্ব: নিবন্ধনকৃত @ প্রাপ্তিপ্রসঙ্গ.কম (২০১৬-২০২৬)
Developed by- .::SHUMANBD::.